এখনও রয়ে গেছে সিডরের ক্ষতচিহ্ন
২০০৭ সালে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর, যা বিদ্যুৎ, খাদ্য এবং আশ্রয়শূন্য করে দিয়েছিল গোটা জনপদকে। কেউ কেউ তাণ্ডবের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও বাঁচাতে পারেননি নিকট আত্মীয়স্বজনকে। কারো কারো মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেলেও অনেকে রয়েছেন নিখোঁজ। সেদিনের সে মহাপ্রলয়ের নয় বছর কেটে গেলেও আজও স্মৃতির মানসপটে দুঃস্বপ্নের মতো ভেসে ওঠে। আজও কাঁদায় এবং ভয়ে শিউরে ওঠে এলাকার মানুষজন। সিডরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যতম জেলা ভোলার মানুষজন বর্তমানে কেমন আছেন- তা নিয়ে ছোটন সাহার চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব।
সিডর-বিধ্বস্ত ভোলা উপকূলের বিপন্ন জনপদে এখনও যেন সিডরের ক্ষতচিহ্ন শুকায়নি। আয়ের উৎস হারিয়ে আজো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্তরা। এছাড়া এনজিও থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। এতো কিছুর পরও ক্ষতিগ্রস্তরা পাচ্ছেন না পর্যপ্ত সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা।
সিডর-বিধ্বস্ত ভেলুমিয়া, ইলিশা, রামদাসপুর, মনপুরা, বোরহানউদ্দিন ও চরফ্যাশন উপজেলার বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সিডরে সহায়-সম্বল হারিয়ে তাদের দুঃখ-দুদর্শার সীমা নেই। আয়ের উৎস ও মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে তাদের আশ্রয় হয়েছে নদীপাড়ের বেড়ি বাঁধে কিংবা রাস্তায়। সেখানেও জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
ইলিশা গ্রামের যুবক এমরান হোসেন বলেন, সিডরে ১১টি গরু, ৫টি ছাগল এবং ৩ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। ধার-দেনা আর ঋণ নিয়ে সম্পদ গড়লেও, তা মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যায়। ওই ঋণের বোঝা নিয়ে এখনও দিন কাটাচ্ছি।
ক্ষতিগ্রস্ত তাহের মাঝি বলেন, সিডরের জোয়ারে পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, ভেঙে গেছে ঘরটিও। আজও নতুন করে ঘর তুলতে পারিনি।
কালুপুর গ্রামের গৃহবধূ তাসলিমা বলেন, আমরা গরিব মানুষ। দিন এনে দিন খাই, কিন্তু সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো সাহায্য পাইনি।
ক্ষতিগ্রস্ত গিয়াস উদ্দিন বলেন, সিডরে খামারের ৪০০ মুরগি মারা যায়। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মুরগির খামার করেছিলাম। কিন্তু আট বছরেও ওই ঋণ পরিশোধ করতে পারিনি। ঋণের বোঝা নিয়েই এখনও আছি।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, ভোলার বিচ্ছন্ন এলাকা ও উপকূলের জনপদে একের পর এক দুর্যোগ এলেও এখনও অরক্ষিত উপকূলের মানুষ। তারা এখনও ঝড়ের পূর্বাভাস পায় না। যার ফলে ঝড়ের সময় কোনো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না তারা। ঝড়ের সময় কোনো মাইকিং হয় না বলেও অভিযোগ তাদের।
লর্ডহার্ডিঞ্জ এলাকার লোকমান হোসেন, সিরাজ উদ্দিন ও লাল মিয়াসহ অন্যরা বলেন, আকাশে মেঘ দেখলেই বুঝতে পারি ঝড় আসবে, কিন্তু কত নম্বর সিগনাল তা জানতে পারি না।
সদরের ইলিশা গ্রামের বাঁধে আশ্রয় নেয়া মো. হোসেন ও তোফাজ্জল জানায়, নদীর কাছে বসবাস করে আসছি, বান-তুফান এলে আমরা বাঁচার জন্য ছোটাছুটি করি কিন্তু ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাই না।
তবে ভোলা একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগকালীন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে আনা হয় এবং জরুরি ভিত্তিতে দুর্যোগ-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে তাদের সহযোগিতা করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ছোটন সাহা/এফএ/আরআইপি