ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সব স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল

জেলা প্রতিনিধি | নওগাঁ | প্রকাশিত: ০৫:০১ এএম, ১৬ মার্চ ২০১৭

দিনমজুরির কাজ করে ছেলেকে পড়াশুনা করাতেন। পেটে খাবার না জুটলেও ছেলেকে কোনো অভাব বুঝতে দেননি বাবা-মা। কষ্টের মাঝেও স্বপ্ন দেখেতেন। ছেলের পড়াশুনা শেষে চাকরি হলে অভাব মোচন হবে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সব স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল।

কথাগুলো বলছিলেন আর বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আরতী বালা; গেল ১০ মার্চ নওগাঁ ফিশারি গেটের সামনে যার ছেলে শ্যামলকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। নিহত শ্যামল নওগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কম্পিউটার বিভাগের ৬ষ্ট সেমিস্টারে লেখাপড়া করছিলেন। 

সরেজমিনে বুধবার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বারান্দায় স্থানীয়রা শ্যামলের বাবা-মা ও বোনকে ঘিরে বসে আছেন। সবাই তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। কোনো কথায় যেন তাদের মন মানছে না। ঘটনার পর থেকে এলাকাই বইছে শোকের ছায়া।

জেলার পত্নীতলা উপজেলার মাটিন্দর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চল বাজকোলা গ্রামে শ্যামলদের বাড়ি। জেলা শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে দুই ঘর বিশিষ্ট মাটির বাড়িটিতে টিন ও মাটির টালির ছাউনি। তাও আবার অন্যের জমিতে। যা আছে সেটিও এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। দিনমজুরির কাজের উপর জীবিকা নির্বাহ।

২০১৪ সালে বামইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৪ দশমিক ৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় নওগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কম্পিউটার বিভাগে ভর্তি হন। এরপর থেকে কলেজ পাড়ায় একটি ছাত্রাবাসে থাকতেন।

Naogaon
লেখাপড়া থেকে শুরু করে সর্বদিক দিক দিয়ে সহযোগিতা করতেন সাবেক স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন। এছাড়া এলাকাবাসীও সহযোগিতা করতেন। কলেজ থেকে উপবৃত্তির টাকাও পেতেন। গত দুই বছর আগে ছেলের সখ পূরোণ করতে শেষ সম্বল দুই শতাংশ জমিও বিক্রি করে একটি ল্যাপটপ কিনে দেন বাবা গোপালচন্দ্র।

শ্যামলের পরিবার এতোটাই নিঃশ্ব যে তার সৎকার করার টাকাও ছিল না। এলাকাবাসীর সহযোগীতায় ডাল-চাল উঠিয়ে তা বিক্রি করে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা দিয়ে কিছুটা খরচ বহন করে। এছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষও কিছুটা সহযোগিতা করে।

ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদে গত ৮ মার্চ কলেজ ক্যাম্পাসে আতোয়ার ও শ্যামলের মধ্যে মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এরই জের ধরে শ্যামলকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শ্যামলের বাবা গোপাল চন্দ্র বর্মণ বাদী হয়ে নওগাঁ সদর থানায় নয়জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ছয়-সাতজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় কলেজের ৭ম সেমিস্টারের ছাত্র আতোয়ার হোসেন ও মোহাম্মদ রনি এবং চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্র ফয়সাল হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এনভাইরোনমেন্ট বিভাগের ৭ম সেমিস্টারের ছাত্র তারিকুল ইসলাম তারেক বলেন, শ্যামল ছিল প্রতিবাদী ছাত্র। কয়েকদিন আগে আতোয়ারসহ তার সহযোগীরা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করায় সে প্রতিবাদ করে। এর প্রেক্ষিতে শ্যামলকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে।

শ্যামলের দুলাভাই উজ্জল ও খালাতো ভাই রমেশ চন্দ্র বর্মন বলেন, শ্যামল খুব মেধাবী ছিল। প্রতিবাদী হওয়ায় তাকে জীবন দিতে হলো। আর কোনো শ্যামলকে যেন এভাবে জীবন দিতে না হয়।

শ্যামলের বাবা গোপাল চন্দ্র বলেন, সবার সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে ছেলেকে কষ্ট করে পড়াশুনা শেখাচ্ছিলাম। অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু কষ্টের ফল ভোগ করতে পারলাম না। এখন নিঃশ্ব হয়ে গেলাম। যারা এ খুনের সঙ্গে জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

এ বিষয়ে নওগাঁ সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোরিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনজনকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। আদলাতে তারা ১৬৪ ধারা জবানবন্দি দিয়েছে এবং ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। মামলার বাকি আসামিদের গ্রেফতারে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
 
আব্বাস আলী/এফএ/পিআর