বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগ : সুযোগ বুঝে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ
চুয়াডাঙ্গায় বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত চাষিরা যখন দিশেহারা, সমাধনের জন্য ছুটছেন দিক-বিদিক ঠিক তখনি চুয়াডাঙ্গার দায়িত্বরত সিনজেন্টা কোম্পানির কর্মকর্তারা সুযোগ বুঝে সরবরাহ করেছেন মেয়াদ উত্তীর্ণ ফিলিয়া নামক ওষুধ। এ যেন ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের মরার ওপর খাড়ার ঘা। সহজ সরল চাষিরা ওষুধ ব্যবহারের পর জানতে পেরেছেন সিনজেন্টার ওই ওষুধ ছিল মেয়াদ উত্তীর্ণ।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমি। আর ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল হেক্টর প্রতি ৩.৮ মেট্রিক টন। সে হিসাবে ১ লাখ ২৬ হাজার ৯০৩ মেট্রিক টন। কিন্তু চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমি। লক্ষ্যমাত্রার চাইতে ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ বেশি হয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ করে আবহাওয়াজনিত কারণে নেক ব্লাস্ট রোগে ৬৮ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দফতর জানিয়েছে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৪০ হেক্টর, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ১৪ হেক্টর, দামুড়হুদা উপজেলায় ১০ হেক্টর ও জীবননগর উপজেলায় ৪ হেক্টর বোরো ধানের জমি ব্লাস্ট আক্রান্ত হয়েছে। ব্লাস্ট আক্রান্ত জমির পরিমাণ ৬৮ হেক্টর জমি নিরূপণ করা হলেও এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে বলে চাষিরা মনে করছেন।
এদিকে জমির ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। আগাম ব্যবস্থা নেয়া হলে ক্ষতির পরিমাণ কম হতো। কিন্তু কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তারা এটি নেননি এবং যথাসময়ে মাঠেও নামেননি বলে অভিযোগ চাষিদের। তবে চাষিদের সকল অভিযোগ সঠিক না বলেও দাবি করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
মাঠ পর্যায়ের কৃষি অফিসাররা ছত্রাকজনিত নেক ব্লাস্ট সংক্রামণ থেকে বোরো ধান রক্ষা করার জন্য নাটিভো, ফিলিয়া, ট্রোপার, প্রভিফেন জাতীয় ছত্রাকনাশক ওষুধ দেয়ার পরামর্শ দেয়। ফলে আক্রান্ত এলাকায় ওই সমস্ত ওষুধের সঙ্কট দেখা দেয়।
হিজলগাড়ী বাজার পাড়ার কৃষক আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে রায়হান বলেন, যখন ধানে কোনো রোগ দেখা দেয়নি আমি তখন থেকে সিনজেন্টা কোম্পানির নাটিভো ব্যবহার করছি। এ বছর ৪ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো ধান এমনকি কৃষিবিভাগের প্রদর্শনী প্লটে ২৯ জাতের ধান লাগিয়ে নিয়মিত নাটিভো ওষুধ ব্যবহার করেও তা রক্ষা করতে পারিনি।
কান্দিপুর গ্রামের চাষি ঝন্টু, আলিহীম, সুদেব, ডিহি গ্রামের হামিদুল্লাহ ও কৃষ্ণপুর গ্রামের জাহিদুল ইসলাম একই সুরে বলেন, সিনজেন্টা কোম্পানির সরবরাহকৃত ওষুধ ফিলিয়া ব্যবহার করেও শেষ রক্ষা হয়নি। ওই ওষুধ ব্যবহারের পর জানতে পারলাম ৩ মাস আগেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ওষুধের বোতলের গায়ে এমনভাবে মেয়াদ উত্তীর্ণের সময় লেখা আছে যা সহজে কাহারো পক্ষে বোঝা সম্ভব না।
২০১৭ সাল দেখেই কিনে নিয়ে ব্যবহার করেছি। মাসের দিকে খেয়াল করিনি। পরে জানতে পারি মেয়াদ উত্তীর্ণ ওই ওষুধ অন্য জেলা থেকে কোম্পানির লোকজন এনে আমাদের এখানে সরবরাহ করেছে। যার মেয়াদ গত জানুয়ারি মাসে শেষ হয়ে গেছে। এখন জেনইে বা কী করার আছে।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার তালহা জুবায়ের মাসরুর বলেন, আমি বিষয়টি জানার পরপরই চুয়াডাঙ্গায় দায়িত্বরত সিনজেন্টার লোকজনকে ওই ওষুধ বাজার থেকে সরিয়ে নিতে বলেছি।
এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গায়র দায়িত্বরত সিনজেন্টা কোম্পানির সেলস প্রমোশন অফিসার মাসুদ রানা ও মার্কেটিং অফিসার হারুন-অর-রশিদ বলেন, চুয়াডাঙ্গায় ফিলিয়া ওষুধের ক্রাইসিস ছিল বলে অন্য জেলা থেকে আনা হয়েছিল। কয়েক কাটুন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ভুল করে চলে এসেছে। এবং কয়েকজন চাষি তা ব্যবহার করেছে বলে জানতে পেরেছি। জানার পরপরই বাকি ওষুধগুলো বাজার থেকে তুলে নিয়েছি।
সালাউদ্দীন কাজল/এফএ/এমএস