দুর্বল লাইনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বারবার লাইনচ্যুত হচ্ছে ট্রেন!
মান্ধাতা আমলের ইঞ্জিন আর দুর্বল রেললাইনে ত্রুটিসহ ক্লিপ চুরি হওয়ার কারণে পূর্বাঞ্চল রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশে রয়েছে ৭৫ কিলোমিটার রেলপথ। এই রেলপথের বেশিরভাগ জায়গা অরক্ষিত হওয়ায় রেললাইনের ক্লিপ চুরি করে নিয়ে গেছেন দুর্বৃত্তরা। এর ফলে পুরাতন এই রেললাইনগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর এই দুর্বল লাইন দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে ট্রেন। লাইনে ত্রুটি ও নাশকতার কারণে গত সাড়ে তিন মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঁচটি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি দুপুর সোয়া দুইটায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার পাঘাচং রেলস্টেশনের কাছে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ৭টি বগি বিকট শব্দে লাইনচ্যুত হয়। এ ঘটনায় দ্রুত ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে ট্রেনের অন্তত ১০ যাত্রী আহত হন। এ ঘটনার পরপরই ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে আখাউড়া লেকোসেড থেকে একটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। উদ্ধার কাজ শেষে ৯ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টায় পুনরায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
এদিকে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার গঙ্গাসাগর রেলস্টেশনের কাছে চট্টগ্রামগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আখাউড়া থেকে একটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ শেষে ৪ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টায় ট্রেন চলচল স্বাভাবিক হয়।
এরপর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সোয়া ৪টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন পুনিয়াউট রেলক্রসিং এলাকায় ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। পরে আখাউড়া লোকোসেড থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার কাজ শেষে সাড়ে ৭ ঘণ্টা পর রাত পৌনে ১২টায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের সহকারী মাস্টার মাইনুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গত ৫ মার্চ বেলা ১১টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন পুনিয়াউট রেলক্রসিং এলাকায় নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের ৬টি বগি বিকট শব্দে লাইনচ্যুত হয়। এ ঘটনার পর থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে আপ লাইনে (ঊর্ধ্বমুখী) ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় টানা ১১ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিলে রাত পৌনে ১০টায় পুনরায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে আপ লাইনে (ঊর্ধ্বমুখী) ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
সর্বশেষ গত শুক্রবার বিকেল সোয়া ৫টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার পাঁঘাচং রেলস্টেশন এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা কন্টেইনার ট্রেনের একটি বগির চারটি চাকা লাইনচ্যুত হয়ে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেটের আপ লাইনে (ঊর্ধ্বমুখী) ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আখাউড়া লোকোসেড থেকে একটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারকাজ শেষ করলে রাত ৮টার দিকে পুনরায় ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেটের আপ লাইনে (ঊর্ধ্বমুখী) ট্রেন চলাচল স্বাভবিক হয়।
তবে প্রতিটি দুর্ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠিত হলেও প্রয়োজনীয় নজরদারি আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই বারবার এসব দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ।
এ ব্যাপারে আখাউড়া রেলওয়ে জংশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা নিয়মিত রেললাইন চেকআপ করে থাকি, কিন্তু আমাদের ট্রেনের বেশিরভাগ ইঞ্জিন ও রেললাইন পুরাতন হয়ে গেছে। পাশাপাশি কিছু কিছু জায়গায় মাদকসেবিরা রেললাইনের ক্লিপ চুরি করে নিয়ে গেছেন। তবে রেলে নাশকতা ঠেকাতে প্রতি কিলোমিটার রেলপথে তিনজন করে নিরাপত্তা প্রহরী কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এস.এম মুরাদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, কিছু দুর্ঘটনা লাইনের ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তবে আশুগঞ্জ থেকে চিনকি আস্তানা পর্যন্ত নতুন রেললাইন বসানোর কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হবে।
এমজেড/আরআই