ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

নওয়াপাড়ায় ব্রিজ নির্মাণে পাথর নিয়ে তোলপাড়

প্রকাশিত: ০৬:০১ এএম, ০৮ মে ২০১৭

যশোরে ‘ম্যাক্স র‌্যাংকেন’ নামে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ১ লাখ ঘনফুট ‘নিম্নমানের সাদা পাথর’ মজুদ করেছে।রাসায়নিক পরীক্ষার পর এই পাথরের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যশোরের নওয়াপাড়ায় ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ব্রিজে এই পাথর ব্যবহারের চেষ্টার পর ওই পরীক্ষা করা হয়।

মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর নওয়াপাড়া ব্রিজে সাদা পাথর ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি বলে দাবি করেছে এলজিইডি। কিন্তু ম্যাক্স র‌্যাংকেনের দাবি, সারাদেশে তাদের ৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পের অনেকগুলোতে এই সাদা পাথর ব্যবহার করা হলেও কেউ মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি।

যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম সিদ্দিকী জানান, যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদের ওপর ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০২ মিটার দীর্ঘ সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। ২০১৫ সালে এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর পর প্রায় ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন পরিদর্শন করে জানা যায়, ভৈরব নদে নির্মাণাধীন ব্রিজ এলাকায় প্রায় ১ লাখ ঘনফুট ‘সাদা পাথর’ মজুদ রয়েছে। এই ব্রিজে ব্যবহারের জন্য এই পাথর মজুদ করা হয়। চলতি বছর শুরুর দিকে এলজিইডি ঢাকার কর্মকর্তারা নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় এই ‘সাদা পাথর’ নিয়ে সন্দেহ হলে এটি পরীক্ষার নির্দেশ দেন।

যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম সিদ্দিকী জানান, নির্দেশনা অনুযায়ী গত ০৮ মার্চ এক পত্রে সাদা পাথরের মান পরীক্ষার জন্য যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসাইন খানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। গত ৯ এপ্রিল তিনি সাদা পাথর পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান করেন। গত ৩০ এপ্রিল ঢাকায় এলজিইডির এক সেমিনারেও এই রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়।

এদিকে, সাদা পাথরের এই রিপোর্ট প্রকাশের পর এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। ড. মো. জাভেদ হোসাইন খানের রিপোর্ট অনুযায়ী, সাদা পাথরে ‘সিল্ট’ পাওয়া গেছে ১৫ শতাংশ, যা ৫ শতাংশের বেশি থাকার কথা নয়। ‘সিলিকা’ সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ গ্রহণযোগ্য হলেও এতে এর পরিমাণ ৬৫ শতাংশ। অত্যন্ত ক্ষতিকর ‘স্মেকটাইড’ ও ‘পটাশিয়াম’ এর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে এই পাথরে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রিজ, ভবনের মত স্থাপনায় এই পাথর ব্যবহার করা হলে ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এর অভ্যন্তরে ফাটল দেখা দিতে পারে। কারণ এই সময়ের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই সিল্ট এক ধরণের ‘জেল’ তৈরি করবে, যা ভেতর থেকে কংক্রিটের বন্ধনকে আলগা করে দেবে। এছাড়া জাপানসহ অনেক দেশেই ‘স্মেকটাইড’ যুক্ত পাথর ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে এই পাথরে নির্মিত স্থাপনা ওই সময়ের পর ধসে পড়তে পারে।

ড. মো. জাভেদ হোসাইন খান এই পরীক্ষায় সাদা পাথরের সঙ্গে আমাদের দেশে সাধারণত ব্যবহৃত ‘কালো পাথরের’ তুলনামূলক চিত্রও উপস্থাপন করেছেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসাইন খান পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

bridge

সূত্র জানিয়েছে, ‘ম্যাক্স র‌্যাংকেন’ এই সাদা পাথর মালয়েশিয়া থেকে আমদানিকৃত উল্লেখ করলেও এই পাথর কোন দেশের তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশের কংক্রিটের স্থাপনা রিসাইক্লিং করে পাথর উৎপন্ন করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এই পাথরের সঙ্গে আমদানিকৃত সাদা পাথরের মিল রয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে ওই পাথর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও রিসাইক্লিং পাথরের বিক্রেতারা তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেছেন, এই পাথর বেজমেন্ট, গ্রামীণ রাস্তা ও স্যুয়ারেজ, ড্রেনে ব্যবহার করা যাবে।

এই সাদা পাথর নিয়ে কথা বলতে চাইলে যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম সিদ্দিকী দাবি করেন, নওয়াপাড়ায় ম্যাক্স র‌্যাংকেন সাদা পাথর নিয়ে আসলেও নওয়াপাড়া ব্রিজের নির্মাণে এই পাথর ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। কারণ ব্রিজের মূল নকশায় ছিল ভারতীয় কালো পাথর।

সাদা পাথর ব্যবহারের অনুমতি চাওয়ায় তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গেলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাদা পাথর ব্যবহারের কোনো অনুমতি দেননি। তাই তারাও এই পাথর ব্যবহার করতে দিচ্ছেন না। তবে তিনি যবিপ্রবির ওই রিপোর্টকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয় ভৈরব নদের ওপর নির্মাণাধীন বিজ্রের দায়িত্বে থাকা ম্যাক্স র‌্যাংকেনর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ার আরিফুল ইসলামের সঙ্গে।

তিনি সাংবাদিকদের জানান, মূল ডিজাইনে ভারতীয় কালো পাথর থাকায় সেটা দিয়েই ব্রিজের নির্মাণ কাজ চলছে। তবে সাদা পাথর আমদানি করে তারা এটি ব্যবহারের জন্য এলজিইডির কাছে অনুমতি চাইলেও এখনও তা পাননি।
নওয়াপাড়ায় তাদের ১ লাখ ঘনফুট সাদা পাথর মজুদ রয়েছে।

তিনি দাবি করেন, এই সাদা পাথর ভারতীয় কালো পাথরের চেয়ে অনেক ভাল। এর ঘর্ষণ সহনশীলতার মাত্রা ১৯। যা ভারতীয় কালো পাথরের (২৬) চেয়ে কম। আর এলজিইডি এই পাথরের কেমিক্যাল টেস্ট করিয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, ইন্টারনেট ঘেটে তারা দেখেছেন বিশ্বের কোথাও এ ধরনের নির্মাণে পাথরের কেমিক্যাল টেস্ট করানো হয় না। সম্ভবত এটিই প্রথম ঘটনা।

তিনি আরও দাবি করেন, ম্যাক্স র‌্যাংকেন সারাদেশে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চট্টগ্রামের ফ্লাইওভার, গোপালগঞ্জের রেললাইনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় এই সাদা পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও এই পাথরের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।

মিলন রহমান/এফএ/জেআইএম