সাড়ে পাঁচ মাসে চিকিৎসকের উপস্থিতি মাত্র ১৩ দিন
বরগুনা সদর উপজেলার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের চিকিৎসক নাসির উদ্দিন আহমেদ। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর তিনি বরগুনার সর্বস্তরের প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য বরগুনার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন।
কিন্তু যোগদানের পর থেকেই তিনি তার কর্মস্থলে মাসে দু’তিন দিন উপস্থিত থেকে বাকি দিনগুলো থাকছেন নিয়মিত অনুপস্থিত। এতে ভেস্তে যেতে বসেছে প্রতিবন্ধীদের জন্য নেয়া সরকারের এই মহৎ প্রকল্পটি। দিনের পর দিন তার অনুপস্থিতির কারণে সেবাপ্রার্থী রোগীরা পড়েছেন চরম বিপাকে।
এছাড়া, বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের পরিবর্তে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে তিনি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নাসির উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধিনে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে বরগুনা জেলা শহরের একমাত্র প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রটি। এই কেন্দ্রে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে বাত ব্যথা থেকে শুরু করে সকলপ্রকার পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগী এবং প্রতিবন্ধীদের সেবায় এখানে বিণামূল্যে উন্নতমানের থেরাপি চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে সরকার।
গত বছরের শেষের দিকে এ কেন্দ্রে যোগদান করেন মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ। যোগদানের পর থেকেই তিনি অনুপস্থিত থাকছেন দিনের পর দিন। যোগদানের পর থেকে গত জানুয়ারি মাসে তিনি অফিস করেছেন মাত্র ৪ দিন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২ দিন, মার্চ মাসে তিনি অফিস করেন ২ দিন, এপ্রিল মাসেও অফিস করেছে ২ দিন আর চলতি মাসে অফিস করেছেন মাত্র তিন দিন। এপ্রিল এবং মে মাসে কোনো অফিস না করলেও হাজিরা খাতায় একদিনে তিনি স্বাক্ষর করেন পেছনের সব অনুপস্থিতির ঘরে।
রেহানা বেগম নামের পক্ষাঘাতগ্রস্থ এক রোগী বলেন, বরগুনা সদর উপজেলার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে এর আগে রফির নামের একজন ডাক্তার ছিলেন। তার সময়ে তিনি নিয়মিত বাম হাতে থেরাপি দিতেন।
তিনি আরো বলেন, ডা. মো. রফিকুল ইসলামের বদলি হওয়ার পর নতুন যে ডাক্তার এসেছেন তিনি নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না জানিয়ে বলেন, ডাক্তার না থাকার কারণে তিনি থেরাপি দিতে পারছেন না।

বরগুনার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের অফিস সহকারী মো. ওয়াসিম আকরাম বলেন, প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের চিকিৎসক নাসির উদ্দিন আহমেদ কখনও মা অসুন্থ কখনো স্ত্রী অসুস্থের অজুহাতে প্রতিমাসে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকেন। এ কারণে চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে এই কেন্দ্রের চিকিৎসা সেবা।
ডা. মো. নাসির উদ্দীন আহমেদ নানা অজুহাতে তার কর্মস্থলে অনুপস্থিত বেশি থাকেন জানিয়ে বরগুনার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে টেকনিসিয়ান মো. শামীম বলেন, ডাক্তার ও জনবল সংকটের কারণে বরগুনার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে স্ব্যাস্থসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে শহর সমাজসেবার সভাপতি মো. সাহাবউদ্দিন সাবু বলেন, ডাক্তার নাসির উদ্দীন যোগদানের পর গত ছয় মাসে আমি যতবার বরগুনা সদর উপজেলার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের খোঁজ খবর নিতে গিয়েছি, তত দিনই আমি ডাক্তারকে অনুপস্থিত দেখেছি। সর্বশেষ গত সোমবার (১৫ মে) সকালেও আমি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি ডাক্তার অনুপস্থিত। তার অনুপস্থিতির কারণে হাজিরা খাতায় তার মে মাসে কোনো স্বাক্ষরও ছিলনা।
তিনি আরও বলেন, বিকেলে যখন শুনি ডাক্তার এসেছেন। তখন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। এসময় আমি তার অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে, তিনি আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এসময় আমি তার হাজিরা খাতা যাচাই করে দেখি তিনি পেছনের সব অনুপস্থিতির ঘরে উপস্থিতির স্বাক্ষর করেছেন। এছাড়াও ডাক্তার মো. নাসির উদ্দীন বিনামূল্যে সেবা প্রদানের পরিবর্তে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেনও বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বেশ কিছু অজুহাত দেখান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মো নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আমি অসুস্থতার জন্য বেশ কিছুদিন ছুটিতে ছিলাম। তবে এর পক্ষে তিনি কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
এ বিষয়ে বরগুনার সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার মুখার্জি বলেন, আমি যতবারই ডাক্তার নাসির উদ্দিনের খোঁজ নিয়েছি, তাকে পাইনি। তিনি অনুপস্থি ছিলেন সবসময়েই। তার কারণে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগটি ভেস্তে যাচ্ছে জানিয়ে উপ-পরিচালক বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমি একাধিকবার অবহিত করেছি। শিগগিরই এর প্রতিকার হবে বলে জানান তিনি।
এমএএস/পিআর