উচ্চশিক্ষায় রাফীর বড় বাধা দরিদ্রতা
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকায় অবস্থিত রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ (আরআরএন) পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। চলতি বছরে সেই বিদ্যালয়ের অধীনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে রাফী হাসান। শিক্ষা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত অভাব-অনটন ও দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত রাফী লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ না পেলেও নিজের মেধার জোরেই ছিনিয়ে এনেছেন গৌরবোজ্জল এ সাফল্য।
রাফী জিপিএ-৫ পেলেও তার পরিবারে এ অর্জনের কোনো মূল্যায়ন নেই। কারণ সে একেবারেই শোচনীয় পরিবারের সদস্য। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।
রাফীর বাক প্রতিবন্ধী মা রুনা বেগম ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজে করেন। বাবা শামীম মিয়া রাফীর ৩ বছর বয়সে তাদের ছেড়ে চলে যান। বাবা কোথায় আছেন? বেঁচে আছেন? নাকি মরে গেছেন? এটা তাদের কাছে অজানা। ১ ভাই ১ বোনের সংসার। ছোট বোন মেহজাবিন ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে কালীগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। দুই ভাই-বোনের লেখা পড়ার খরচ জোগাতে হিমসিম খান মা রুনা বেগম।
২০১১ সালে পিএসসিতে ও ২০১৪ সালে জেএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে রাফী। ২০১৪ সালে জেএসসি মেধা তালিকা অনুসারে বৃত্তিও পায় রাফী। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার কোনো সামর্থ্য তার পরিবারের ছিল না। তখন তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন রাফীর স্কুলের জীব বিজ্ঞানের শিক্ষক নূর মহল বেগম, তার স্কুলের ছাত্র কল্যাণ তহবিল ও বালীগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ওমর আলী মোল্লা।
শিক্ষক নূর মহল বেগম বিনা টাকায় রাফীকে প্রাইভেট পড়াতেন। স্কুলের ছাত্র কল্যাণ তহবিল তার বকেয়া পরিশোধ করতেন। আর শিক্ষক ওমর আলী মোল্লা প্রতি বছর রাফীর বই যোগান দিতেন। কালীগঞ্জ পৌর এলাকার বাঁলীগাও গ্রামের নানাবাড়ির জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস রাফীর পরিবারের। সেই সুবাদে মামারাও তার সাহায্যে এগিয়ে আসতেন। আর এভাবেই মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ রাফীর।
রাফী ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু রাফী মনে করে তার সেই স্বপ্নে বড় বাধা দরিদ্রতা। তাই উচ্চ শিক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে চিন্তিত রাফী। ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা? উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে কিনা? তার স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা?
একদিকে ছেলের স্বপ্ন পূরণে হতাশা অন্যদিকে পরিবারের ঘানি। বাক প্রতিবন্ধী মা রুনা বেগম নিজেও নানা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। ছেলের স্বপ্ন পূরোণ হবে তো? ছেলেকে ভালো কলেজে ভর্তি করাতে পারবো তো?
বালীগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ওমর আলী মোল্লা বলেন, ছেলেটি দরিদ্র। কিন্তু খুবই মেধাবী ও ভদ্র ছেলে। আর তার এই মেধা ও ভদ্রতা দেখে আমি সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছি। এখন সমাজের বিত্তবান মানুষগুলোর সহযোগিতায় রাফীর উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। সম্ভব তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে।
কালীগঞ্জ আরআরএন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুবনা ইয়াসমিন জানান, দরিদ্র ও মেধাবী রাফী এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে আমাদের স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে। সে স্কুলে পড়া অবস্থায় যতটা সম্ভব সহযোগীতা করেছি। এই ছেলেটির ভবিষ্যৎ সহযোগীতায় কোনো বিত্তবান মানুষ এগিয়ে আসলে হয়তো তার উচ্চশিক্ষা ও স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।
আব্দুর রহমান আরমান/এফএ/আরআইপি