ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

অনুষ্ঠান না করেই বিল করেছেন কক্সবাজার বেতারের আরডি

প্রকাশিত: ০৬:৪৩ এএম, ২১ জুন ২০১৭

বাংলাদেশ বেতার কক্সবাজারের এফএম সম্প্রচার জনপ্রিয় করতে ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে সম্প্রতি বহিরাঙ্গন অনুষ্ঠান ‘আলোকিত বাংলাদেশ’ করা হয়। স্থানীয় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চাকে বেগবান করতে একইভাবে রামু, চকরিয়া ও মহেশখালী উপজেলাতেও চলে এ অনুষ্ঠান।

কিন্তু সরকারের এ মহৎ উদ্যোগের বিপরীতে দুর্নীতির মহোৎসব করছেন কক্সবাজার বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান। হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পীর অংশগ্রহণে দায়সারাভাবে দুয়েকটি অনুষ্ঠান করে শিল্পীদের নামে-বেনামে কন্ট্রাক্ট বানিয়ে এসব অনুষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

এসব অনিয়মে প্রধান সহযোগী হিসেবে রয়েছেন বেতারের সঙ্গীত সংকলক মোসলেহ উদ্দিন। ২০০৪ সালে বেতার প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই মোসলেহ উদ্দিন এ স্টেশনে কর্মরত। তাই সব অপকর্ম সংঘটনের পুরোদা হয়ে আরডি`র সহকারী হিসেবেই তিনি কাজ করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা বলছেন, বাস্তবে চারটি অনুষ্ঠানে তিন লাখ টাকার অধিক খরচ করা হয়নি। অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া শিল্পীদের বিপরীতে করা তালিকার অংক অনুযায়ী সম্মানীও দেয়া হচ্ছে না। এখানে সবোর্চ্চ এগার শ’ টাকা এবং সর্ব নিম্ন সি-ক্যটাগরির শিল্পীকে মাত্র ৬২৫ টাকা সম্মানী দেয়া হচ্ছে। অথচ একই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বেতারে বিশেষ শ্রেণির একজন শিল্পীকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, এ-ক্যটাগরিকে ৪ হাজার টাকা, বি-ক্যটাগরিকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সি-ক্যটাগরির শিল্পীকে ৩ হাজার টাকা সম্মানী দেয়া হচ্ছে।

জেলা হিসাব রক্ষণ অফিসে অনুমোদনের জন্য পাঠানো বিলের তাালিকায় দেখা গেছে, পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে ‘আলোকিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক বহিরাঙ্গন অনুষ্ঠানে ৬৪ জন একক শিল্পীর পাশাপাশি দলগত পরিবেশনাও দেখানো হয়। `মলকা বানুর বিয়ের হঁলার` শিল্পী সম্মানী, পোষাক ও প্রসাধনী সরবরাহ, যাতায়াত বাবদ ৩০ হাজার, একইভাবে `পরিবানুর বিয়ের হঁলা` বাবদ ২৭ হাজার, `রাখাইন প্রজাপতি` নৃত্যের জন্য ৩১ হাজার ৭৫০ এবং `ডিজিটাল বাংলাদেশ` শীর্ষক নাটিকার জন্য ৩১ হাজার ৭৫০ টাকাসহ এ চারটি পরিবেশনার জন্য মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়।

একইভাবে চার উপজেলায় শুধুমাত্র এসব দলীয় পরিবেশনার জন্য ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও শুধুমাত্র রামুতে `মলকাবানুর বিয়ের হঁলা` ছাড়া আর কোনো অনুষ্ঠানই বাস্তবে হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ঠ শিল্পীরা।

এছাড়াও কক্সবাজার, রামু, চকরিয়া ও মহেশখালীতে চারটি অনুষ্ঠানে একক শিল্পীর তালিকায় (প্রতিটিতে ৬৪ জন করে) শিল্পীর সম্মানী বাবদ ৭ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে ১৫ জনের বেশি একক শিল্পী কোনো অনুষ্ঠানেই অংশ নেননি। বাকিদের সই নকল করে ভুয়া কন্ট্রাক্ট দেখানো হয়েছে।

বিলের জন্য তৈরি তালিকায় এমন নামও আছে বেতারে যে নামের কোনো অস্তিত্বই নেই। এসব অনুষ্ঠানের জন্য পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে ১ লাখ ৬০ হাজার, স্টেইজ, সাউন্ডে ২ লাখ ২০ হাজারসহ অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। সব মিলে চারটি বহিরাঙ্গনের ব্যয় দেখানো হয় প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা।

এ তালিকা অনুযায়ী পরিচিত শিল্পীদের মাঝে কক্সবাজারের তালিকার ৪ নম্বর ক্রমিকে মানসী বড়ুয়া ১ হাজার ৯০০ টাকা, ২১ নম্বরে মুন মুন চৌধুরী ও সংগীরা ৯ হাজার, ২২ নম্বরে নুরে তানজিলা টিকলী ও সংগীরা ১২ হাজার, ২৪ নম্বরে উপবান বড়ুয়া ৪ হাজার ৫০০, ২৫ নম্বরে তাহনুন কবির রানা ও সংগীরা ১৪ হাজার ২৫০, ২৬ নম্বরে দোলন পাল ৪ হাজার ১৫০, ২৮ নম্বরে মাউন ও সংগীরা ১২ হাজার ৭৫০ ও ২৯ নম্বরে নিনির নামে ৪ হাজার টাকা সম্মানী দেখানো হয়।

রামুর তালিকার ৮ নম্বর ক্রমিকে দ্বীপলাল চক্রবর্তী ৩ হাজার ৪০০ টাকা, ২২ নম্বরে মিনা মল্লিক ও সংগীরা ১২ হাজার টাকা, ২৪ নম্বরে উপবান বড়ুয়া ৪ হাজার ৫০০ টাকা, ২৫ নম্বরে স্বপন ভট্টাচার্য ও সংগীরা ১৪ হাজার ২৫০ টাকা, ২৬ নম্বরে দোলন পাল ৪ হাজার ১৫০ টাকা, ২৮ নম্বরে নোয়েরি রাখাইন ও শিল্পীরা ১২ হাজার ৭৫০ টাকা, ২৯ নম্বরে নিনি ৪ হাজার টাকা, ৫০ নম্বরে সুমি আক্তার ও সংগীরা ১৩ হাজার টাকা, ৫১ নম্বরে শেখ জয়নাল আবেদীন ৫ হাজার ২০০ টাকা ও ৫২ নম্বরে রাহগীর মাহমুদ ১ হাজার ২০০ টাকা টাকা।

চকরিয়ার তালিকায় ২১ নম্বর ক্রমিকে শাওরিন আফ্রিন বিথী ও সংগীরা ৯ হাজার টাকা, ২২ নম্বরে মিনা মল্লিক ও সংগীরা ১২ হাজার টাকা, ২৪ নম্বরে উপবান বড়ুয়া ৪ হাজার ৫০০ টাকা, ২৫ নম্বরে স্বপন ভট্টাচার্য ও সংগীরা ১৪ হাজার ২৫০ টাকা, ২৬ নম্বরে দোলন পাল ৪ হাজার ১৫০ টাকা, ২৮ নম্বরে নোয়েরি রাখাইন ও সংগীরা ১২ হাজার ৭৫০ টাকা, ২৯ নম্বরে নিনি ৪ হাজার টাকা ও ৫০ নম্বর ক্রমিকে জয়িতা চক্রবর্তী ও সংগীরা ১৩ হাজার টাকা, মহেশখালীর তালিকায় ২১ নম্বর ক্রমিকে মানসী বড়ুয়া ও সংগীরা ৯ হাজার টাকা, ২২ নম্বরে অন্তরা ও সংগীরা ১২ হাজার টাকা, ২৪ নম্বরে উপবান বড়ুয়া ৪ হাজার ৫০০ টাকা, ২৫ নম্বরে বনানী চক্রবর্তী ও সংগীরা ১৪ হাজার ২৫০ টাকা, ২৮ নম্বরে মাউন ও সংগীরা ১২হাজার ৭৫০ টাকা, ২৯ নম্বরে নিনি ৪ হাজার টাকা, ৪৬ নম্বরে তাবেয়িন আশরাফী ২ হাজার ১০০ টাকা, ৪৯ নম্বরে চাষী রূপন ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ৫০ নম্বরে জয়ন্তী চক্রবর্তী ও সংগীরা ১৩ হাজার টাকা, ৫১ নম্বরে শেখ জয়নাল আবেদীন ৫ হাজার ২০০ টাকা, ৫২ নম্বরে রাহগীর মাহমুদ ১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী দেখানো হয়েছে।

এসব শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা কেউই এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি।

বিলের তালিকায় নাম থাকা কক্সবাজার বেতারের নাট্য প্রযোজক স্বপন ভট্টাচার্য বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, নাটক পরিবেশন তো দূরের কথা বহিরাঙ্গনের কোনো অনুষ্ঠানেই আমি এবং আমার স্ত্রীর (বনানী চক্রবর্তী) অংশ গ্রহণ ছিল না। শুনে অবাক হলাম রামু, চকরিয়া ও মহেশখালীতে তিনটি অনুষ্ঠানেই আমাদের অংশগ্রহণ দেখিয়ে আমাদের নামে মোটা অংকের বিল বানানো হয়েছে। নিশ্চয় আমাদের স্বাক্ষর নকল করে এ কাজটি করা হয়েছে। বেতারের মতো প্রতিষ্ঠানে এ রকম জঘন্য জালিয়াতি মোটেও কাম্য নয়। এমনটি হয়ে থাকলে আমি আইনের আশ্রয় নেব।

মানসী বড়ুয়া বলেন, কক্সবাজার এবং মহেশখালীতে আমার এবং আমার গ্রুপের অংশগ্রহণ ছিল না। চকরিয়া ও রামুর অনুষ্ঠানে আমরা অংশ গ্রহণ করেছি আর শুধুমাত্র রামুতেই হঁলা পরিবেশনাটি ছিল। তবে পোশাক, প্রসাধনী, যাতায়াত কোনো সুবিধাই আমরা পাইনি। তারা কত টাকা বিল করেছে তাও জানি না। কিন্তু হঁলায় অংশগ্রহণের জন্য ২৫ জন শিল্পী ও কলাকুশলীর সম্মানী এখনো (২০ জুন পর্যন্ত) পায়নি।

কক্সবাজার বেতারের শিল্পী আলম শাহ জানান, পাবলিক লাইব্রেরির বহিরাঙ্গনে বেতারের তালিকাভুক্ত কোনো শিল্পীই ছিল না। যন্ত্রীরা ছাড়া বাকিরা সবাই বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থ সংকটসহ নানা অজুহাতে সারা বছরই রেকর্ডিং এক প্রকার বন্ধ ছিল। হাতেগোনা কয়েকটি বিশেষ অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু নামে বেনামে ভুয়া কন্ট্রাক্ট বানিয়ে শিল্পীদের স্বাক্ষর নকল করে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা বিল করা হয়। আর অনুসন্ধানে শিল্পীদের এ ধরনের অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

কক্সবাজার বেতারের নাট্য প্রযোজক জসীম উদ্দিন বলেন, বেতারের নানা অনিয়মের কারণে অতীতেও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। কিন্তু বর্তমানের অভিযোগ সত্য হলে তা অতীতের সব অনিয়মকে ছাড়িয়ে যাবে।

কক্সবাজার জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সুকোমল বড়ুয়া জানান, বেতারের অনেক বিল জমা হয়েছে। তার মধ্যে ২০ জুন কিছু বিল পাস করা হয়েছে। মূলত কোন বিলগুলো অনিয়মের তা আমরা পরখ করতে পারি না। আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপস্থাপন করা বিল আটকানোর কোনো সুযোগ থাকে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কক্সবাজার বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক (ভারপাপ্ত) মো. হাবিবুর রহমান অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে বলেন, সবগুলো অনুষ্ঠানের বাজেট এক। কিন্তু কক্সবাজার সদরের খরচে মহেশখালী-চকরিয়ায় অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না। তাই সমন্বয় করতেই অনেক কিছু করতে হয়।

বিল পাস হয়ে না আসায় অনেকের সম্মানী এখনো দেয়া সম্ভব হয়নি। এপ্রিল-মে-জুন তিন মাসের বিল একসঙ্গে জমা দিয়েছি। তাই কোন মাসে কত টাকা এবং শিল্পী কতজন তা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

অনুষ্ঠানে অংশ না নিয়েও শিল্পীদের নামে মোটা অংকের বিল করার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। বরং এসব নিয়ে সংবাদ পরিবেশন না করতে অনুরোধ করে প্রতিবেদকের সঙ্গে বসে কথা বলার প্রস্তাবও দেন এ কর্মকর্তা।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম

আরও পড়ুন