হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে বিপাকে স্বজনরা
রবিন বয়স (৩৫) সদর উপজেলা মোহাম্মপুর ইউনিয়নের হরিনারায়নপুর গ্রামের বাসিন্দা। সোমবার স্ত্রীকে পেট ব্যথায় অসুস্থজনিত কারণে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
তীব্র গরমে অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালে বেডের তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেশি। সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছেন ডাক্তার, নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের।
ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল জেলার হতদরিদ্র মানুষের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র হওয়ার কারণে রোগীর সুস্থতার জন্য হাসপাতালে সেবা নিচ্ছেন বেশিরভাগ মানুষ।
রবিনও তার স্ত্রীকে সুস্থতার জন্য বারান্দার একটি কোনে বেডের অভাবে মেঝেতে চাদর বিছিয়ে সেবা নিচ্ছেন। সোমবার ভোর রাতেও যে পরিমাণ রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের ইনডোর, বারান্দা, সিঁড়ির নিচে, আউট ডোর পর্যন্ত মাথা গোঁজানোর জায়গা নেই। তবুও রবিনের স্ত্রীর মতো জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে আত্মীয় স্বজনরা রোগীকে সুস্থ করার আশায় মেঝেতে সেবা দিচ্ছেন।
সারাদিন স্ত্রীর সেবা যত্ম করে হাসপাতালের আউট ডোরে রবিন ক্লান্ত হয়ে একটি চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আর রবিনের পুত্র সন্তান নিরব (৬) জেগেই বাবার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুধু নিরবের বাবা নয়। হাসপাতালর ভর্তি হওয়া প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী স্বজনরা হাসপাতালের আউটডোরে টিকিট কাউন্টারের সামনে, চেয়ারে ঘুমায় বলে জানিয়েছেন ওয়ার্ড বয় জিয়া।
হরিনারায়নপুরের রবিন জানান, স্ত্রীকে একা রেখে কীভাবে বাড়ি যাব। সারাদিন যে গরম রোগীর সেবা করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তাই চেয়ারে একটু বিশ্রাম করতে গিয়ে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বলতেই পারছি না। আর আমার ছেলে নিরব পাশেই বসে আছে।
হরিপুর উপজেলার আমগাঁও ইউনিয়ন থেকে আসা মালেকা জাগো নিউজকে জানান, অতিরিক্ত গরমে ওয়ার্ডে থাকা যায় না। দম বন্ধ হয়ে আসতেছে তাই বারান্দায় একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। ৭ দিন ধরে স্বামী গুরুতর অসুস্থ, টাকার অভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষাগুলোও করতে পারছি না।

রাত ৩টার দিকে শেফালি নামে এক রোগী হাসপাতালে পায়চারি করছে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমরা এক বেডে দুইজন রোগী আছি। এতক্ষণ আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এখন আর একজন ঘুমাচ্ছেন। তাই তীব্র গরমে পায়চারি করছি বারান্দায়।
হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় জিয়াউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমি প্রায় ১০ বছর যাবত হাসপাতালে কর্মরত। যেখানে রোগীর বেড দিতে পারা যায় না, সেখানে স্বজনদের কীভাবে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। হাসপাতালে নতুন ভবন হচ্ছে কর্তৃপক্ষ চাইলে স্বজনদের জন্য বিশ্রামাগার দিতে পারবে। প্রতিদিন রোগীর স্বজনদের দেখে নিজেরও কষ্ট লাগে। কিন্তু কিছু করার উপায় থাকে না।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল ৫০ শয্যা থেকে যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ১০০ শয্যায় উন্নত করা হয়েছে। কিন্তু জনবল আগের মতই রয়েছে। জনবলের জন্য কয়েকজন ডাক্তারের পদ সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত নার্সের সংকট। ওভার টাইম ডিউটি পালন করে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঠাকুরগাঁও শিশু বিভাগের ডাক্তার শাহ জাহান নেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, এই সময়ে হাসপাতালে শিশুসহ সকল বয়সের রোগীর চাপ বেশি। তাই তীব্র বেডের সংকট দেখা দিয়েছে। তাছাড়া রোগীর স্বজনদেরও কষ্ট হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও সিভিস সার্জন ডা. আবু মো. খায়রুল কবির জাগো নিউজকে বলেন, এই হাসপাতালে দুই জেলার মানুষকে সেবা দেয়ার কারণে পরিমাণ মতো সেবা বা বিছানা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। তবুও স্বল্প জনবল দিয়ে সেবা অব্যাহত রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলে আশা করা যায় বিছানা সঙ্কট হবে না। এছাড়া অনেক জনবল, ডাক্তার ও নার্স বৃদ্ধি হবে।
রোগীর স্বজনদের জন্য বিশ্রামাগার করা যেতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, সেই বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। সম্ভাবনা থাকলে অবশ্যই বিশ্রামাগার তৈরি করা হবে।
মো. রবিউল এহসান রিপন/এএম/এমএস