ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

অন্যের স্ত্রী নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় একঘরে দুই পরিবার

জেলা প্রতিনিধি | নওগাঁ | প্রকাশিত: ০৭:৪২ এএম, ৩০ জুলাই ২০১৭

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে দুইটি পরিবারকে একঘরে (আটক) করে রেখেছে ‘সমাজপতিরা’। গত ১০ দিন থেকে একঘরে করে রাখায় অসহায় হয়ে পড়েছে দুই পরিবারের আট সদস্য। বড় ভাই আলেফের অপরাধে ছোট ভাই আব্দুল মালেককে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। এলাকাবাসীর মারধরের ভয়ে এখন ছোটভাইও বাড়িছাড়া।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুলাই সকালে গ্রামের মেছের আলীর স্ত্রী খাইরুন বিবি (৪৫) অসুস্থতার কথা বলে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পতিসরে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বের হন। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেয়।

ঘটনার তিনদিন পর সকালে তার স্বামীকে তালাকনামা পাঠান এবং মোবাইল ফোনে জানিয়ে দেন 'তিনি ভাল আছেন। তার কথা চিন্তা করার দরকার নেই।'

পরে জানা যায় ওই গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চাঁন প্রামাণিকের ছেলে দুই সন্তানের জনক আলেফ ওই নারীকে নিয়ে কৌশলে পালিয়ে গেছে।এলাকায় গুঞ্জন চলছে স্বামীকে তালাক দিয়ে বিয়ে করেছেন তারা।

কিন্তু ঘটনার পর ‘সমাজপতিরা’ আলেফের ছোট ভাই আব্দুল মালেককে তাদের খুঁজে দেয়ার জন্য তিনদিন সময় বেঁধে দেয়। বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের পর আলেফকে খুঁজে না পেলে জরিমানা স্বরূপ প্রতিদিনের জন্য ৫ হাজার টাকা করে দিতে হবে। আব্দুল মালেক তিনদিনের মাথায় তার বড় ভাইকে খুঁজে না পেয়ে জরিমানা দেয়ার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।

এরপর তিনি থানায় এলাকার সমাজপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু অভিযোগের কারণে কোনো বৈঠক ছাড়াই ‘সমাজপতিরা’ আব্দুল মালেক ও বড় ভাই আলেফের পরিবারকে একঘরে করে রাখে। এরপর থেকে ওই দুই পরিবারের সঙ্গে এলাকার লোকজনকে কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না এবং আত্মীয় স্বজনদের তাদের বাড়িতে আসতে দেয়া হচ্ছে না।

Naogaon

আব্দুল মালেকের বাবা চাঁন প্রামাণিক সবজির ব্যবসা করেন। কয়েকদিন থেকে দোকান করতে না পারায় সবজিগুলো নষ্ট হচ্ছে। এখন বাড়ি থেকেও বাইরে যেতে পারছেন না তারা। একঘরে করে রাখায় পরিবার দুটি মানবেতর জীবন যাপন করছে।

স্থানীয় হাসান আলী, মহসিন আলী, সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন, আব্দুল মালেককে বলা হয়েছিল তার ভাইকে তিনদিনের মধ্যে খুঁজে দেয়ার জন্য। চারদিনের মাথায় সে ভয়ে বাড়ি থেকে চলে যায়। সমাজের সিদ্ধান্তে তাদেরকে একঘরে করে রাখা হয়। এরপর থানায় অভিযোগ করে।

ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে আমার তেমন সম্পর্ক নেই। তারপরও ভাইকে খোঁজার দায়িত্ব দেয় সমাজ থেকে। আর ভাইকে না পেলে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা ধার্য করে। গরীব মানুষ দিন আনি দিন খাই। এত টাকা পাবো কোথায়। গ্রাম থেকে পালিয়ে আছি মাতব্বরদের মারপিটের ভয়ে। এখন একঘরে করে দেয়া হয়েছে। বাড়িতে অসুস্থ মা আছে তার সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছি না।

গ্রামের ‘সমাজপতি’ শহিদুল ইসলাম বলেন, সমাজ থেকে ওই পরিবারকে একঘরে রাখার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অভিযুক্তের ছোট ভাই আব্দুল মালেকের মধ্যে আতংক থাকায় সে গ্রামে থাকে না। তিনি প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন।

তবে তিনি বলেন, যেহেতু আলেফ গ্রামের এক গৃহবধূকে নিয়ে পালিয়েছে। সেহেতু সে গ্রামে ফিরে এলে ফতোয়া মোতাবেক মৌলভী দ্বারা দোররা (পাথর) মেরে ও তওবা পড়িয়ে সমাজে স্থান দেয়া হবে।

গ্রামের আরেক সমাজপতি আজাদুল ইসলাম বলেন, এ বিষয় নিয়ে সমাজ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আর জরিমানার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে কতিপয় কিছু ব্যক্তি গুজব রটিয়েছে যে ওই দুই পরিবারকে একঘরে করে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আল্লামা শেরই বিপ্লব বলেন, আলেফকে খুঁজে দেয়ার জন্য আব্দুল মালেককে সমাজ থেকে বলা হয়েছিল। যদি খুঁজে দিতে না পারে এজন্য ১৫ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। যার জন্য গ্রাম থেকে আব্দুল মালেক পালিয়ে গিয়ে গ্রামবাসীর উপর থানায় অভিযোগ করে।

অপরদিকে আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বদরুদ্দোজা বলেন, ওই পরিবারকে একঘরে করে রাখা এবং থানায় অভিযোগ দেয়ার বিষয়ে জানা নেই।

আব্বাস আলী/এফএ/পিআর

আরও পড়ুন