ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

২ বছরেই ওরা আলোর জগতের বাসিন্দা

জেলা প্রতিনিধি | পঞ্চগড় | প্রকাশিত: ১২:৩৪ পিএম, ৩১ জুলাই ২০১৭

বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের ২ বছরের মাথায় আলোর জগতে প্রবেশ করেছেন পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা। দুই বছর আগে আজকের দিনে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছিল এখানকার মানুষ। বাংলাদেশ ভারতে বহুল আলোচিত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পর বাংলাদেশি ভূখণ্ডে যোগ হয় ১১১ ভারতীয় ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি।

এরই ধারাবাহিকতায় জেলার বিলুপ্ত ৩৬ ছিটমহলও যোগ হয় পঞ্চগড়ের বাংলাদেশি ভূখণ্ডে। এরপর অবহেলিত এসব জনপদে শুরু হয় সরকারের বিশেষ বরাদ্দের উন্নয়ন কাজ। সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তিন বছর মেয়োদি নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজও শেষ হয়েছে। কিছু প্রকল্পের কাজ এখনও চলছে।

৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে গত দুই বছরে যেন আলোর জগতে প্রবেশ করেছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার গারাতিসহ বিলুপ্ত ৩৬ ছিটমহলের বাসিন্দারা। সরকারের নানামুখী উন্নয়নে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। একসময় নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এসব এলাকার শিশুদের মিথ্যা নাম-পরিচয়ে লেখাপড়া করতে হতো। এখন নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যাতায়াতের জন্য পাকা সড়ক আর বিদ্যুতের আলোয় শিশুদের লেখাপড়া যেন তাদের জীবনকে আলোকিত করে তুলেছে।

Panchagarh

সদর উপজেলার বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহলের রাজমহল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা ছিদ্দিকা জাগো নিউজকে জানায়, এর আগে আমাদের এলাকার রাস্তা দিয়ে ঠিকমতো হেঁটে চলা যেত না। আমাদের কোনো স্কুলও ছিল না। মিথ্যা নাম-পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশি স্কুলে লেখাপড়া করতে হতো। এখন আমরা পাকা রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য সাইকেলটিও দিয়েছে স্কুল থেকে।

একই প্রতিষ্ঠানের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী পিয়ারা আক্তার বলে, এখানে কোনো স্কুল ছিল না। আমি নানির বাড়ি থেকে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশি স্কুলে লেখাপড়া করেছি।

২০১৫ সালে ছিটমহল বাংলাদেশ হওয়ার পর এখানে নতুন স্কুল হয়েছে। দুই বছর ধরে এখানকার (রাজমহল উচ্চ বিদ্যালয়) স্কুলেই লেখাপড়া করছি।

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে (১ আগস্ট) বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ৬৮ বছরের বন্দিজীবন থেকে মুক্ত হয় ছিটমহল বাসিন্দারা।

Panchagarh

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা বাংলাদেশি নাগরিক এবং ভারতে ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দারা ভারতের নাগরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ঐতিহাসিক এই দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে বিলুপ্ত বিভিন্ন ছিটমহলে ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বলন এবং ১ আগস্ট সকালে বিলুপ্ত পুঠিমারি ছিটমহলে আনন্দ শোভাযাত্রা, শিশুদের খেলাধুলাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

সত্তর বছর বয়সী বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহল এলাকার আনার আলী জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের কোনো মানুষের মর্যাদা ছিল না। এলাকায় কোনো আইন-কানুন ছিল না। একজন নাগরিক যেসকল সুবিধা পেত আমরা তা পেতাম না। আমাদের শিশুরা ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে ছিটমহলের পাশের স্কুলে লেখাপড়া করত। সন্ধার পর একটু আলোর জন্য কুপিবাতি আর মোমবাতিই ছিল ভরসা। এখন এলাকার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের আলো আমাদের জীবনযাপন বদলে দিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার অন্ধকার জগৎ থেকে আমাদের আলোর জগতে নিয়ে এসেছে।

বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন, মজাম্মেল হক, আল-আমিনসহ অধিকাংশ বাসিন্দার দাবি, গত দুই বছরে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন হয়েছে ছিটমহল এলাকায়। ছিটমহলের পাশে বাংলাদেশি এলাকার অনেক বাড়িতে এখনও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। কিন্তু বিলুপ্ত ছিটমহলের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। উন্নত যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, আইনগত সহায়তার ব্যবস্থায় তারা এখন আলোর জগতের মানুষ।

Panchagarh

গারাতি ছিটমহলের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজার রহমান বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের ২ বছরে পঞ্চগড়ের ৩৬ বিলুপ্ত ছিটমহলে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের আলোয় আমরা আলোকিত হয়েছি। আমাদের পাকা সড়ক হয়েছে। ব্রিজ, কালভার্ট, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে। এসবের জন্য আমরা বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, দুই বছর আগেও আমি সরকারি কাজে বিভিন্ন ছিটমহলে গিয়েছিলাম। তখন তাদের আর্থসামাজিক যে অবস্থা আমি দেখেছি, আর এখন যা দেখছি, এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। তারা মূলত একটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় বসবাস করত। বর্ষাকালে তারা মূল শহরের দিকে আসতে পারত না। এখন প্রত্যেক এলাকায় পাকা সড়ক হয়েছে। স্কুল ও মাদরাসা হয়েছে, উচ্চতর শিক্ষার জন্য কামিল মাদরাসা এবং ডিগ্রি কলেজ হয়েছে।

তিনি বলেন, তিন বছর মেয়াদি কিছু প্রকল্পের কাজ এখনও চলছে। সব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সেখানকার মানুষদের জীবনযাপন আরও উন্নত হবে।

সফিকুল আলম/এমএএস/পিআর