‘এক কাপড়ে আর কত দিন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকব’
দুই মাস পরও নানা বঞ্চনার অভিযোগ রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ধসের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের। অনেকের অভিযোগ, এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা পাননি তারা। আশ্রয়কেন্দ্রে দুই বেলা খাবার পানি খেলেও আর্থিক বা ত্রাণসহায়তা কিছুই পাননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় সরকারি কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নেয় রাঙ্গামাটির স্বজন ও বাড়িঘরহারা ক্ষত্রিগ্রস্ত মানুষ। ধসে সম্পূর্ণ ও আংশিক বিধস্ত পরিবারের পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে অবস্থান নেন পাহাড়ের পাদদেশে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস করা মানুষ। এদের বাইরেও অনেকে আছেন আত্মীয়ের বাড়ি ও ভাড়া বাসায়- যারা সরকারি সহায়তার আশায় পুনর্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ওই ঘটনায় রাঙ্গামাটি শহরে সরকারিভাবে ১৯ আশ্রয়কেন্দ্র খোলে জেলা প্রশাসন। পরে অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে চালু রাখা হয়েছে ৬টি। এসব কেন্দ্রে এখনও হাজারের অধিক মানুষ অবস্থান করছে বলে জানায় প্রশাসন।
-20170816182916.jpg)
মঙ্গলবার সরেজমিনে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, গাদাগাদি করে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছেন নারী-শিশুসহ আশ্রিতরা। এ সময় অনেকের সঙ্গে কথা বললে নানা অবহেলা বঞ্চনার অভিযোগ করেন তারা। অনেকে সরকারি সহায়তা পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও অনেকে বঞ্চনার অভিযোগ করেছেন।
তাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় কমিশনাররা। তারা ঘটনাস্থল না গিয়ে নিজেদের মতো করে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা তৈরি করছেন। সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দ কোথায় যায়, কে নেয় তাও জানেন না ক্ষতিগ্রস্তরা।
রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাস কেন্দ্রের হাসনা বেগম (২৮), রাবেয়া (২৫), তৈয়বা (৫৫), আমেনা বেগম (৫০), হারিতা বেগম (৪৫), ফাতেমা বেগম (৬৫), শাহীনুর বেগমসহ (২৬) অনেকে বলেন, তারা শহরের ভেদভেদী নতুনপাড়া এবং রূপনগর এলাকা থেকে বাড়িঘর হারিয়ে অবস্থান করছেন ওই আশ্রয়কেন্দ্রে।
তাদের সবার একই কথা, ‘আমাদের সব গেছে, কিছুই নেই। অনেকে এক কাপড়ে এতটা দিন আশ্রয়কেন্দ্রে। স্বজন, বাড়িঘর হারিয়ে এতটা দিন মানবেতর পরিস্থিতিতে। আশ্রয়কেন্দ্রে দুই বেলা খাবার পানি খেতে পাচ্ছি। কিন্তু এছাড়া আর কোনো আর্থিক কিংবা ত্রাণসহায়তা নেই। ঘর নেই বাড়ি নেই। আমরা কোথায় যাব কোথায় থাকব? এভাবে আর কত দিন? সরকার পুনর্বাসন করবে বলছে কিন্তু আজও কোনো খোঁজখবর নেই। শুধু দিন গুণছি পুনর্বাসনের অপেক্ষায়। বলা হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রও বন্ধ করে দেয়া হবে। এরই মধ্যে আমাদের যেখানে খুশি চলে যেতে বলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যাব কোথায়? কোথাও যাওয়ার থাকলে এভাবে এতটা দিন কী এখানে পড়ে থাকতাম?’
রাঙ্গামাটির জিমনেশিয়াম কেন্দ্রের অরুণ বিকাশ ত্রিপুরা জানান, তার বাসা শহরের এলজিইডির পাশে। ১৩ জুলাই ভারি বৃষ্টির সময় এলজিইডির রক্ষা দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। যেকোনো সময় তা ধসে তার বাসার ওপর পড়তে পারে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা উল্টো জেলা প্রশাসককে বুঝিয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে দুই বেলা খাবার পেলেও তিনি সরকারি-বেসরকারি বা কোনো এনজিও থেকে সহযোগিতা পাননি। কে তালিকা করে তাও জানেন না। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় তার নাম উঠেছে কিনা তাও জানেন না।
হাসপাতালের আশ্রয় শ্রেন্দ্র অবস্থান নেয়া পশ্চিম মুসলিম পাড়া উলুছড়ির বাসিন্দা নুর ইসলাম জানান, ১৩ জুন পাহাড়ধসে তার ঘর মাটিচাপা পড়ে। তারা কোনো রকমে বেঁচে যান। কিন্তু পৌরসভা, জেলা প্রশাসন বা এনজিও কারও কাছ থেকে এক ফোটা সাহায্য পাননি। যাদের তালিকা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের অনেকেই অন্যদের সাহায্যের চাল, ডাল নিয়ে গেছে বলে তার অভিযোগ। তিনি পৌরসভার ভিজিএফ চালও পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
-20170816183146.jpg)
একই আশ্রয় শ্রেন্দ্রর দক্ষিণ মুসলিমপাড়ার মনসুর আহম্মদ জানান, মাটিচাপায় তার বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধস্ত হয়। সরকারি-বেসরকারি অনেকে নাম নিয়ে যায় কিন্তু তিনি কিছু পাননি। সোহেল নামে এক ব্যক্তি তার ইচ্ছামাফিক তালিকা করে ত্রাণ সামগ্রি ভাগ করছেন। কিছু জানতে চাইলে উল্টো হুমকি দেন।
জিমনিসিয়ামে আশ্রয় নেয়া উলুছড়ি এলাকার দীপন ত্রিপুরা জানান, তাদের বাড়িঘর মাটি চাপা পড়েছে। সেখানে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি আর নেই। সে রাঙ্গামাটি পাবলিক কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র। আশ্রয় কেন্দ্রে থেকে পড়াশোনা করতে কষ্ট হয়। আশ্রয় শ্রেন্দ্র থাকার মতো পরিবেশ নেই। আবার ভাড়া বাসায় থাকার ক্ষমতাও নেই। তাই সরকারের কাছে দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি তার।
একই কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া যুব উন্নয়ন এলাকার উঠন্তিপাড়ার জ্ঞানবান চাকমা জানান, ভূমিধসে তার বাড়িঘর বিধস্ত হয়ে গেছে। বেশী দিন আর আশ্রয় কেন্দ্রে থাকতে চান না। যত দ্রুত সম্ভব সরকারের কাছে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। একই দাবি শিমুলতলী মনো আদম এলাকার বাসিন্দা অমুল্য সেন চাকমার।
গত ১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় রাঙ্গামাটি ১২০ প্রাণহানি ঘটে। আহত হন অনেকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহু ঘরবাড়ি। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ঠিকানা এখনও আশ্রয় কেন্দ্রে।
যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবু শাহেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ৬ আশ্রয় কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে শহরে। এসব কেন্দ্রে অবস্থান করছেন প্রায় ১২০০-১৩০০ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। তাদের ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে কর্তৃপক্ষ।
সুশীল প্রসাদ চাকমা/এএম/আরআইপি