কুড়িগ্রামে বন্যায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা
দুই দফা বন্যায় কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের পাকা ও কাঁচা সড়ক বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে ও ছিঁড়ে গেছে। এতে ভেঙে পড়েছে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলা শহরের সঙ্গে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গত দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে সারাদেশের সঙ্গে এই তিন উপজেলার প্রায় সোয়া ৭ লক্ষাধিক মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
রাজারহাট উপজেলার বোয়ালমারী বড়পুল নামক স্থানে রেলসেতুর একটি গার্ডার ডেবে যাওয়ায় কুড়িগ্রাম জেলার সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রাস্তা মেরামতের কাজ এখন পর্যন্ত শুরু না হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঈদে ঘরমুখো মানুষ পড়েছে চরম বিড়ম্বনায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফুলবাড়ী উপজেলার এলজিইডি’র ৪০ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব সড়কের পিচ ঢালাই উঠে গেছে। অন্যান্য সেক্টরগুলো বাদ দিয়ে এলজিইডি’র ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকার মতো। ধরলা নদীর স্রোতের তোড়ে ৪টি সড়কের ১৫টি পয়েন্ট ভেঙে ভেসে গেছে।

ফুলবাড়ী বাংটুরঘাট সড়কের উত্তর বড়ভিটায় ২০ মিটার, চর-বড়লই ৪০ মিটার, চর-বড়লই বাংলা বাজার এলাকায় ৯০ মিটার, ফুলবাড়ী বালারহাট সড়কের কবির মামুদের আজিজার মাস্টারের বাড়ির পেছনে ৩০ মিটার ও গোরকমন্ডল আবাসন সড়কে ৫০ মিটার স্রোতে ওয়াশ আউট হয়ে গিয়ে বড়বড় গর্তের সৃষ্টি করেছে। যার গভীরতা প্রায় ১০ থেকে ২০ গজ। খোচাবাড়িতে দুটি ব্রিজ দেবে গেছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের ফুলবাড়ী দ্বিতীয় ধরলা সেতু সড়কটির তিনটি স্থানে কোথাও ১৫ মিটার কোথাও ১৫/২০ মিটার ভেঙে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ও ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু কিছু কালভার্ট ও ব্রিজের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে যানবাহন চলছে ধীরগতিতে।
ফুলবাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী শামসুল আরেফীন খান জানান, এই উপজেলায় দুইটি রাস্তার ৯টি স্থানে ১৮০ মিটার ওয়াশ আউট হয়ে গেছে। এ রাস্তাগুলোতে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি রাস্তাগুলো চলাচলের উপযোগী করে তোলার জন্য। কোথাও বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দিয়ে লোক চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পানি নেমে গেলে স্থায়ীভাবে মেরামত করা হবে।
এদিকে ভুরুঙ্গমারী উপজেলার সঙ্গে ৬টি ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্যায় এলজিইডি বিভাগের ৩৫ দশমিক ১৭ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার স্রোতে এলজিইডি বিভাগের বলদিয়া থেকে চায়না বাজারগামী রাস্তায় ১টি ব্রিজ, সুগলপার থেকে রাঙ্গালের কুটি রাস্তায় ১টি ব্রিজ, সোনাহাট চরভুরুঙ্গামারী রাস্তায় ১টি গার্ডার ব্রিজ এবং পাথরডুবিতে একটি ব্রিজ ভেঙে গেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তালতলায় একটি ব্রিজসহ ৩টি ব্রিজ ভেঙে গেছে।
ভুরুঙ্গামারী থেকে সোনাহাট স্থলবন্দরগামী রাস্তার ৫টি স্থানে রাস্তা ভেঙে গভীর খাদের সৃষ্টি হওয়ায় দুধকুমার নদের পূর্ব তীরের চরভুরুঙ্গামারী, সোনাহাট, বলদিয়া, বল্লভেরখাস, কচাকাটা ও কেদার ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে।
সোনাহাটস্থল বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ’র সভাপতি সরকার রকীব আহমেদ জানান, স্থলবন্দরগামী রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যাওয়ায় মাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। শতশত শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলা প্রকৌশলী এন্তাজুর রহমান জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন জেলা সদরে পাঠানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী সড়কের পাটেশ্বরী ও উত্তর কুমরপুর এলাকায় ৪টি স্থানে রাস্তা ভেঙে গিয়ে রাস্তায় গভীর গর্ত হওয়ায় গত ১২ আগস্ট থেকে ৩টি উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সরাসরি কোচ সার্ভিস বন্ধ থাকার ফলে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলোর তালিকা ও স্টিমেট তৈরির কাজ চলছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে কাজ শুরু করা হবে।
জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবিএম খুরশীদ আলম জানান, কিছু কিছু রাস্তায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোয় ব্রিজ অথবা গর্ত পূরণ করা হবে কিনা- এ বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে একটি বিশেষজ্ঞ টিম কুড়িগ্রামে অবস্থান করছে। শিগগিরই তাদের মতামতের ভিত্তিতে সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে।
নাজমুল হোসাইন/আরএআর/আইআই