চটের বস্তায় সোনার আলো
গ্রামে ঢুকতেই রাস্তার পাশে বাঁশ বাগানের নিচে ছোট্ট একটি ঘর। টিনের চালা, বেড়াও টিনের। কাঠের তৈরি দরজা তাও আবার ভাঙা। দুইটা জানালার একটা বন্ধ আরেকটা বন্ধ করার উপায় নেই, কারণ সেটাও ভাঙা। জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে ভেতরে। দরজার পাশেই ছোট্ট একটি সাইনবোর্ডে লেখা “চৌধুরীপাড়া উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়”।
দরজা দিয়ে ঢুকতেই সামনে পড়লো মনোরম এক আল্পনা। রং তুলি দিয়ে নয়, এটা ছেলে মেয়েদের ব্যবহৃত স্যান্ডেল দিয়ে তৈরি। কাছে যেতেই শব্দ শোনা যাচ্ছে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা একসাথে গাইছে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি”। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বেঞ্চের পরিবর্তে ছাত্র/ছাত্রীরা চটে বসে আছে। বৈদ্যুতিক পাখা তো দূরের কথা, সংযোগও নেই।
কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সদরপুর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এটি।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এই স্কুলের এমনটিই চিত্র চোখে পড়লো এ প্রতিবেদকের। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা মাটিতে চট বিছিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে স্কুলের শিক্ষিকার সঙ্গে গাইছে “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি”। এই স্কুল থেকেই তারা শিখছে দেশের প্রতি ভালবাসা আর বই পুস্তকের প্রাণ অ, আ, ক, খ। প্রায় ৩০-৩৫ জন ছেলে মেয়ে একসাথে বসে রয়েছে, আর শিক্ষিকা শারমিন আক্তার মালা সবার মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের শেখাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পরে শেষ হলো জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া। শিক্ষিকা ছাত্র/ছাত্রীদের লিখতে দিলেন- আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, জেলেরা নদীতে মাছ ধরে।

ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়লো। খাতা, কলম, পেন্সিল ও স্কেল বের করার জন্য। খাতার সাদা পৃষ্ঠা বের করে তার উপরে কাঠ পেন্সিল দিয়ে শুরু হলো লেখা। সবাই লিখছে। একমনে লিখছে তারা। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। যে যার মতো করে লিখছে। হঠাৎ সুমাইয়া (৮) উঠে দাঁড়ালো। বললো আপা লেখা শেষ। তারপর নয়ন (৮), সুরুজ (৯), জীম (৮), মারিয়া (৮), জেবা (৯) একে একে সবাই উঠে বললো লেখা শেষ।
বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষিকা শারমিন আক্তার মালা জানান, এই স্কুলে বর্তমানে ৩৭ জন ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করছে। এর মধ্যে ১৫ জন ছেলে ও ২২ জন মেয়ে। এরা সবাই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। ভালো কোনো বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সামর্থ নেয় কারো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াও ভাগ্যে নেয় এদের। কারণ খাতা কলম কেনার মতো সামর্থ নেয় তাদের পরিবারের। তাই আমরা এই স্কুলের ছেলে মেয়েদের বই, খাতা, কলম, পেন্সিলসহ যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণ করে থাকি।
তিনি আরো জানান, গত বছর এই বিদ্যালয় থেকে ৩০ জন ছাত্র/ছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি (পিএসসি) পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৭ জন এবং ৩ জন “এ” গ্রেড পেয়েছে। এই সাফল্য ধরে রাখার জন্য এবারো কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি এবার ৩৭ জনই জিপিএ-৫ পাবে। এই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে উপজেলার “বন্ধন সংস্থা” নামের একটি এনজিও।

বন্ধন সংস্থার পরিচালক তাহাজ্জেল হোসেন বাদশা জানান, ১৯৯৫ সালে হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণের জন্য এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ব্র্যাকের সহযোগিতায় ২০০১ সালে সংস্থাটি ৭টি উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষা প্রোগ্রাম চালু করে। এই স্কুলে যেসব ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করে তারা সবাই হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়ে। আমরা এই সকল ছেলে মেয়েদের শিক্ষা উপকরণ বিনামূল্যে দিয়ে থাকি। তাছাড়া এখানকার কোনো বাচ্চাকে কোনো রকম ফি দিতে হয় না।
তিনি আরো জানান, গত বছর বন্ধন সংস্থা পরিচালিত ৭টি বিদ্যালয় থেকে মোট ২০১ জন ছাত্র/ছাত্রী সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০০ জন ও “এ” গ্রেড পেয়েছে ১০১ জন। তাছাড়া ১৯ জন ছাত্র/ছাত্রী বৃত্তি লাভ করেছে। এর মধ্যে ৭ জন ট্যালেন্টফুলে ও ১২ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করেছে।
এ ব্যপারে মিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন জানান, বন্ধন সংস্থা পরিচালিত বেশ কয়েকটি স্কুল থেকে ছাত্র/ছাত্রীরা এবার পিএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিল। শিক্ষার্থীদের রেজাল্টও ভালো।
আল-মামুন সাগর/এফএ/এমএস