ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

বন্যপ্রাণীর ‘মা’ তানিয়া খানের জন্মদিন আজ

জেলা প্রতিনিধি | মৌলভীবাজার | প্রকাশিত: ০৫:২১ পিএম, ১৭ জুন ২০১৯

নিজের জীবন ও সম্পদ দিয়ে অসুস্থ বন্যপ্রাণীর সেবা করে যাওয়া বন্যপ্রাণীর ‘মা’ খ্যাত প্রয়াত তানিয়া খানের ৪৯তম জন্মদিন আজ। ১৯৭২ সালের ১৭ জুন তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেও চাকরিতে যোগ দেননি তিনি। আজীবন বন্যপ্রাণীর সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তানিয়া খানের সেবা পেয়ে গত দেড় দশকে ৩০-৩৫ প্রজাতির পাঁচ হাজারের অধিক পাখি এবং ৮-৯ প্রজাতির চার শতাধিক বন্যপ্রাণী প্রাণ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি মুক্ত হয়ে ফিরে গেছে নীড়ে। আজীবন বন্যপ্রাণীর সেবা করে যাওয়া এই মহীয়সী নারী চলতি বছরের ১৩ মার্চ মারা যান।

নিজের জমানো টাকার পাশাপাশি স্বামী এবং বাবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব সম্পদ তিনি খরচ করেছেন বন্যপ্রাণীর সেবায়। দীর্ঘদিন মৌলভীবাজার শহরতলির সোনাপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। ভাড়া বাসায় বন্যপ্রাণীদের সেবা দিতে সমস্যা হওয়ায় বাবার থেকে পাওয়া ঢাকার একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেন তিনি। পরে মৌলভীবাজার শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ কালেঙ্গায় জায়গা কিনেন। সেখানে বন্যপ্রাণীদের সেবার জন্য গড়ে তুলেছেন ‘সেভ আওয়ার আনপ্রোটেক্টেড লাইফ (সোল)’। যার মাধ্যমে একটি রেসকিউ সেন্টার চালু করে হাজারো বন্যপ্রাণীকে সেবা দিয়েছেন তিনি।

জীবিত থাকা অবস্থায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তানিয়া খানের। তিনি বলেছিলেন, পশুদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল ছোটবেলা থেকেই। বাবা মো. ওয়াজেদুল ইসলাম বাড়ি ফেরার সময় প্রায়ই অসুস্থ কুকুর-বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে আসতেন। অসুস্থ বন্যপ্রাণীকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব তাকে দিতেন। ওই বয়সে মায়ের মতো পরম মমতায় কোলে করে প্রাণীদের সুস্থ করে আবার মুক্ত করে দিতেন। সেই থেকে বন্যপ্রাণীদের প্রতি অন্যরকম ভালোলাগা শুরু হয়।

স্বামী ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার একেএম মুনির আহমেদ খানের বাড়ি সুনামগঞ্জ হলেও তার চাকরিস্থল মৌলভীবাজার হওয়ায় ২০০৯ সাল থেকে সেখানেই বসবাস শুরু করেন তারা। স্থানীয় বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ও লাউয়াছড়া এবং হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মতো বিশাল এলাকায় শুরু হয় তানিয়ার বিচরণ। ছোটবেলা থেকে তার মধ্যে যে প্রাণীপ্রেম ছিল, বন কর্মকর্তার সঙ্গে বিয়ে তা নতুন মাত্রা এনে দেয়। বিয়ের পর কখনো স্বামী মুনীর আহমেদ খানের সঙ্গে, কখনো একা, কখনো অন্যদের সঙ্গে দলবেঁধে বন থেকে বনে ছুটে বেড়িয়েছেন বন্য প্রাণীপ্রেমী তানিয়া খান।

tania

স্বামীর সঙ্গে তানিয়া খান

২০১৫ সালে তার স্বামী মারা গেলে বন্যপ্রাণীর প্রেমে মৌলভীবাজারেই থেকে যান তানিয়া। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার সুবিধার্থে ঢাকায় থাকেন। ছেলে-মেয়েরা বার বার তানিয়া খানকে নিয়ে যেতে চাইলেও যাননি। তানিয়ার যুক্তি ছিল আমার ছেলে-মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়ে নিজেরাই চলতে পারবে। কিন্তু বনেজঙ্গলে থাকা হাজার হাজার বন্যপ্রাণীর কি হবে। বন্যপ্রাণীরাও আমার সন্তান, আমি তাদের রেখে যেতে পারি না। মৃত্যুর সময়ও তানিয়ার কাছে একটি মেছো বাঘের বাচ্চা, ৭-৮টি কুকুর এবং প্রায় ১০০টির মতো পাখি ছিল। যাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

২০১২ সালের পর থেকে দেশে বন্যপ্রাণীর তথ্য ভান্ডার সমৃদ্ধ করেন তানিয়া খান। বন্যপ্রাণীর সেবার পাশাপাশি তিনি অনেক নতুন প্রাণী আবিষ্কার করেছেন।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখায় চলতি বছর বঙ্গবন্ধু জাতীয় পুরস্কার (মরণোত্তর) পাচ্ছেন বন্যপ্রাণী গবেষক ও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বন্যপ্রাণী সেবা কেন্দ্র ‘সোল’ (সেভ আওয়ার আনপ্রোটেক্টেড লাইফ)-এর পরিচালক প্রয়াত তানিয়া খান।

আগামী ২০ জুন, বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০১৯’ এবং ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৯’ অনুষ্ঠানে তানিয়া খানের পরিবারের সদস্যদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

tania

বন বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন-২০১৯’-এর ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, খ্যাতিমান গবেষক, বিজ্ঞানী, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মী বা ব্যক্তিত্ব’ ক্যাটাগরিতে তানিয়া খান এ পুরস্কার পাচ্ছেন।

তানিয়া খান ২০১৪ সালে হবিগঞ্জের সাতছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে খুঁজে পান থ্রি স্টামস বাংকিং নামের একটি পাখি। এই পাখি দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় এবং দেশে প্রথম দেখার রেকর্ড হয়। ২০১৩ সালে সাতছড়িতে হিল ব্লু ফ্লাই ক্যাচার খুঁজে পান। তিনি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ‘পাইড ওয়ার্টি ফ্রগ’ নামের একটি ক্ষুদ্র ব্যাঙ আবিষ্কার করেন ২০১২ সালে। এছাড়া ‘বুশ ফ্রগ’ জাতের আরও একটি ব্যাঙের দেখাও পেয়েছেন তিনি।

২০১২ সালে প্রথম এবং ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মৃত ‘চিকিলা ফুলেরি’ নামের একটি প্রাণী আবিষ্কার করেন তানিয়া খান। এটি একটি বিরল প্রাণী। মৌলভীবাজারের আদমপুরে ‘ফলস কোবরা’ নামের একটি সাপ এবং লাউয়াছড়ায় ‘হিমালয়ান মোল’ নামের এক প্রাণী আবিষ্কার করেন। এ দুটি প্রাণীও দেশে প্রথম দেখার রেকর্ড তানিয়ারই। এ পর্যন্ত যৌথভাবে প্রজাপতি, বামন মাছরাঙা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

tania

তানিয়া খান নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, আমরা যারা বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করি তাদের অনুপ্রেরণা ছিলেন তানিয়া খান। তিনি যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে বন্যপ্রাণীদের নিয়ে কাজ করেছেন এবং মাতৃস্নেহে প্রাণীদের সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছেন তা কল্পনাতীত।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক ও সাবেক সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দো বলেন, বন্যপ্রাণীর সেবায় অনেকেই কাজ করছেন। কিন্তু আমার জীবনে তানিয়ার মতো এত আন্তরিক কাউকে দেখিনি। মা যেমন নিজের সবকিছু উজাড় করে সন্তানের জীবন রক্ষা করেন, বন্যপ্রাণীদের নিজ সন্তান ভেবে তাই করতেন তানিয়া।

রিপন দে/আরএআর/জেআইএম

আরও পড়ুন