ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হয় ৪ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

জেলা প্রতিনিধি | ব্রাহ্মণবাড়িয়া | প্রকাশিত: ০৮:৩৯ পিএম, ০৩ নভেম্বর ২০১৯

দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কগুলোর মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি অন্যতম। প্রতিদিন এই মহাসড়ক দিয়ে ছোট-বড় কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, সরাইল ও বিজয়নগর উপজেলার অংশে বেশ ককেয়টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

তবে বিদ্যালয়গুলোর সামনে জেব্রা ক্রসিং না থাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপদে পারপারের জন্য গাড়ি থামাচ্ছেন না চালকরা। এর ফলে ঝুঁঁকি নিয়ে মহাসড়ক পারাপারের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে যেমন ভয় কাজ করে তেমনি আতঙ্কে থাকেন অভিভাবক-শিক্ষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ, সরাইল ও বিজয়নগর উপজেলার অংশে অন্তত ১০টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের কোনোটির সামনে নেই জেব্রা ক্রসিং। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন মহাসড়ক পারপার হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। মহাসড়ক পারাপার সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে। গত কয়েক বছরে বিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে সরাইল উপজেলার দুই বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এক শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন বিদ্যালয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে, আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, রাজাবাড়ীয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিজয়নগর উপজেলার রামপুর এলাকার রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই চারটি বিদ্যালয়ের অবস্থান একেবারে মহাসড়ক লাগোয়া। তাই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা সবসময় দুর্ঘটনার আতঙ্কে থাকে। এসব বিদ্যালয়ের সামনে জেব্রা ক্রসিং নেই। ফলে বিদ্যালয়গুলোর সামনে যেমন গাড়ি থামানো হয় না, তেমনি গতিও কমায় না গাড়িচালকরা।

গত বছর রাজাবাড়ীয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র রেজাউল করিম (৭) স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরার পথে একটি বাসের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়। একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রশওন আরা (১২) কয়েক বছর আগে স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিদ্যালয়ের সামনে একটি ট্রাক চাপা দেয়। দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়ে এখন পঙ্গু জীবনযাপন করছে সে। চার বছর আগে আকাশ মীর নামে চতুর্থ শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের সামনে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তার পা ভেঙে যায়। পরে কয়েক মাস চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়।

৭-৮ বছর আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে কুট্টাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হয়। তবে নিহত শিক্ষার্থীর নাম জানাতে পারেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই সময় এই বিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষার্থী একসঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়।

কুট্টাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী নিশাত মণি তানিয়া জানায়, আমাদের বিদ্যালয়টি মহাসড়কের পূর্বপাশে অবস্থতি। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের বাড়ি পশ্চিম পাশে। আমরা মহাসড়ক পারাপার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হই। আমরা শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তাই আমাদের কথা চিন্তা করে বিদ্যালয়ের সামনে যেন একটি জেব্রা ক্রসিং অথবা ফুটওভারব্রিজ দেয়া হয়। তাহলে আমরা নিরাপদে মহাসড়ক পারাপার হতে পারব।

সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো রাজাবাড়ীয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রওশন আরা জানায়, প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল ছুটির পর বাড়ি যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার পা হারিয়েছি। গাড়িগুলো অনেক গতিতে চলে। স্কুলের সামনে জেব্রা ক্রসিং না থাকায় গাড়িগুলো থামে না কিংবা গতি কমায় না। তাই প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের স্কুলের সামনে একটি জেব্রা ক্রসিং চাই, যাতে করে দুর্ঘটনায় আমার মতো কেউ পঙ্গু না হয়।

Highway-School

একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আরিফুল ইসলাম জানায়, সবসময় ভয় লাগে গাড়ি কখন আমাদের ওপরে এসে ওঠে যায়। একবার স্কুলে আসার পথে একটি মোটরসাইকেল আমাকে ধাক্কা দেয়। তখন অনেক ব্যথা পেয়েছিলাম।

রামপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রুমা আক্তার জানায়, মহাসড়কে গাড়িগুলো অনেক বেশি গতিতে চলে। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে অনেক ভয় করে। অনেক সময় শিক্ষকরা আমাদের পারাপার করে দেন। আমরা চাই আমাদের স্কুলের সামনে ফুটওভারব্রিজ অথবা জেব্রা ক্রসিং তৈরি করা হোক।

শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক পারাপার নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকেন তাদের অভিভাবক-শিক্ষকরা। এ অবস্থায় বিদ্যালয়গুলোর সামনে জেব্রা ক্রসিং তৈরি করে দুর্ঘটনার হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অনুফা বেগম নামে এক অভিভাবক বলেন, স্কুল থেকে আসার পথে আমার মেয়ে রওশন আরাকে একটি ট্রাক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ওই দুর্ঘটনার কারণে তার একটা পা কেটে ফেলে দেয়া হয়েছে। মেয়েটা এখন পঙ্গু জীবন যাপন করছে। আমার মেয়ের মতো দুর্ঘটনায় আর যেন কেউ পঙ্গু না হয়। স্কুলের সামনে গাড়িগুলোর গতি যেন কম থাকে সেই ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।

মনির মিয়া নামে আরেক অভিভাবক বলেন, জীবিকার তাগিদে সকালে কাজে বের হই। আমার ছেলে জীবন তার বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যায়। সবসময় ভয়ে থাকি কখন দুর্ঘটনা ঘটে। সন্তানদের নিয়ে আমাদের ভয় দূর করতে এবং নিরাপদ পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।

কুট্টাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমাদের স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে শিক্ষার্থীরা। সবসময় আতঙ্কে থাকি কোন সময় কোন দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের দাবি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারপারের জন্য স্কুলের সামনে যেন জেব্রা ক্রসিং তৈরি করা হয়।

রাজাবাড়ীয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীপা চৌধুরী বলেন, আমাদের স্কুল একেবারে মহাসড়ক লাগোয়া। তাই প্রায়ই ছেলে-মেয়েরা স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়। এটা নিয়ে আমারও ভয়ে থাকি। অনেক সময় আমরা নিজেরা শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক পারপার করে দেই। আমাদের স্কুলে সামনে কোনো জেব্রা ক্রসিং নেই। দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে স্কুলের সামনে একটি জেব্রা ক্রসিং তৈরি করা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সরকারের নির্দেশনা আছে মহাসড়ক সংলগ্ন যত স্কুল আছে সেগুলোতে সীমানাপ্রাচীর দেয়ার। আর কোথায় জ্রেবা ক্রসিং বা স্পিড ব্রেকার দিতে হবে সেটা সড়ক বিভাগ ভালো বলতে পারবে। তবে আমাদের চাওয়া হলো বিদ্যালয় এলাকা যেন ঝুঁকিমুক্ত হয়। জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আমি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. রুহুল আমীন বলেন, বিষয়টি নিয়ে সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উন্নয়ন সমন্বয় সভায় কথা হয়েছে। যেসব বিদ্যালয়ের সামনে জেব্রা ক্রসিং দরকার সেখানে দেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন বলেন, জাতীয় মহাসড়কে ইচ্ছা করলেই অনেক কিছু করতে পারি না। তবে মহাসড়ক লাগোয়া স্কুলগুলোতে পর্যায়ক্রমে জেব্রা ক্রসিং দেয়া হবে।

আজিজুল সঞ্চয়/এএম/এমএস