একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা শাহজাহান
কতিপয় কর্মকর্তার অসৎ কর্মকাণ্ডে যখন পুলিশের প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা জন্ম নিয়েছে ঠিক তখন সততা আর পেশাগত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বরগুনার (সদর সার্কেল) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেন। নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, দ্রুত সময়ে অপরাধী গ্রেফতারসহ ইভটিজিং ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে তার ভূমিকা ইতোমধ্যেই নজর কেড়েছে বরগুনাবাসীর।
আসামি গ্রেফতারে দক্ষতা
রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের চারদিন আগে ঢাকায় সিআইডির দুই মাসব্যাপী একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান হোসেন। রিফাত হত্যাকাণ্ডের একদিন পর প্রশিক্ষণ শেষ না করেই বরগুনা আসেন তিনি। এরপর শুরু করেন আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের গ্রেফতার অভিযান। তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে খুব অল্প সময়েই গ্রেফতার হয় এ মামলার আসামি রাশেদুল হাসান রিশান ফরাজি, ওয়ালিউল্লাহ অলি ও মো. তানভীর হোসেন। আর নয়ন বন্ডের গ্রেফতার অভিযানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। সেই সময়ে সবচেয়ে আলোচনায় থাকা নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি- রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার ডিজিটাল ও অন্যান্য বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের নেপথ্যের কারিগরও এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এছাড়াও বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে কর্তব্যরত এক চিকিৎসককে মারধরের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের জন্য সোচ্চার হন তার সহকর্মী ও সচেতন মহল। বিভিন্ন স্থানে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে পালিত হয় মানববন্ধন কর্মসূচি। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেনের নেতৃত্বেই এ ঘটনার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন আসামি সজল।
বরগুনার বেতাগীতে এক কণ্ঠশিল্পীকে গণধর্ষণ এবং এ ঘটনায় মামলা দায়েরের খবর যখন গণমাধ্যমে ফলাওভাবে প্রকাশিত হয়, তখন এ মামলার সব আসামিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান হোসেনের নির্দেশনা ও সহযোগিতায় গ্রেফতার করে পুলিশ।
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার ক্যাম্পেইন
তরুণ প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এবং আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান হোসেন যান বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করেন দেশপ্রেম ও ক্যারিয়ার ভাবনা বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ভাবনা, মানবীয় গুনাবলীর বিকাশ এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি।

এ বিষষেয় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহজাহান হোসেন জানান, জীবনের শুরু থেকেই তরুণ প্রজন্মকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তোলা এবং ক্যারিয়ার সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন
বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের হতদরিদ্র শ্যামল চন্দ্র মাল বলেন, আমার একমাত্র ছেলে শুভ চন্দ্র মাল (১৯) দুমাস আগে স্থানীয় প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী আমার ছেলেকে একটি দেশীয় অস্ত্রসহ পুলিশে দেয়। আমার ছেলের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলাও দায়ের করা হয়। এরপর আমার ছেলেকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিলের জন্য লবিং তদবিরও করে সেই প্রভাবশালীরা। এ ঘটনায় একাধিকবার সরেজমিনে এসে তদন্ত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেন স্যার।
তিনি আরও বলেন, শাহজাহান স্যার নিরপেক্ষ তদন্ত করেছিলেন বলেই আমার ছেলেটি একটি মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেয়েছে। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কয়েকদিন জেল খাটলেও আমার ছেলেটি তার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য রক্ষা পেয়েছে।
বরগুনার ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের ব্যবসায়ী খোকন খাঁ বলেন, আমার বাড়িতে ডাকাত হানা দিয়ে স্বার্ণালংকারসহ নগদ টাকা নিয়ে যায়। আমরা ডাকাতদের কাউকে চিনতে পারিনি। পরে নিরুপায় হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করি। এরপর শাহজাহান স্যারসহ পুলিশ সদস্যরা আমার বাড়িতে একাধিকবার এসে কথা বলেন। ঘটনার সাতদিনের মধ্যেই এক ডাকাতকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
কমিউনিটি পুলিশিং এবং ওপেন হাউস ডে

বরগুনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি। এসব কমিটির নিয়মিত সভা আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট বিরোধ নিস্পত্তি ও মাদক এবং জঙ্গিবাদ দমনে স্থানীয় জনসাধারণকে সচেতন করে যাচ্ছেন মো. শাহজাহান হোসেন। এ কারণে বরগুনার কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম অনেক গতিশীল বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল। অন্যদিকে বরগুনা ও বেতাগী উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ১০ থেকে ১২ জন গ্রাম পুলিশ নিযুক্ত রয়েছে। এসব গ্রাম পুলিশকে আরও বেশি দায়িত্ব সচেতন ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে নিয়মিত চৌকিদারি প্যারেড আয়োজন করেছেন তিনি।
এছাড়াও পুলিশ ও সাধারণ জনগণের নানা সীমাবদ্ধতা ভাবনায় রেখে বরগুনা ও বেতাগী থানায় ‘ওপেন হাউস ডে’ আয়োজন করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অপরাধ দমনে করণীয় বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা করেন তিনি।
জনতা ও পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়ন
সাধারণ মানুষ ও পুলিশের মধ্যে সেতুবন্ধন দৃঢ় করতে কাজ করছেন মো. শাহজাহান হোসেন। আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি ছাড়াই চলতি পথে হাট-বাজারে বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। স্থানীয় নানা বিষয়ে খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি অপরাধ দমনে সবার সহযোগিতা চান তিনি। মিষ্টভাষী ও সদা হাস্যোজ্জল এই পুলিশ কর্মকর্তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ স্থানীয়রা।

বরগুনা শহরের ব্যবসায়ী খোকন হাওলাদার বলেন, স্যার আমাদের এখানে মাঝে মাঝেই আসেন এবং কেউ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে কি-না সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন। পুলিশ সম্পর্কে মানুষের যে বিরুপ ধারণা আছে, স্যারের সাথে কথা বললে যেকোন মানুষের সেই ধারণ পাল্টে যাবে।
সড়কে শৃঙ্খলা ও সচেতনতা
চালক এবং যাত্রীদের সচেতনতা ব্যতীত সড়কের শৃঙ্খলা তথা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহজাহান হোসেন বিভিন্ন সময় বরগুনার সকল মোটরসাইকেল, বাস ও থ্রি-হুইলারসহ রিকশা স্ট্যান্ডে যাত্রী, চালক ও তাদের সহযোগিদের নিয়ে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা করেন তিনি।তার এমন উদ্যোগের ফলে ইতোমধ্যেই বরগুনার সকল থ্রি-হুইলারের মালিক ও চালকরা ডানপাশের যাত্রী ওঠানামার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং
বরগুনা সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বরগুনা সদর ও বেতাগী উপজেলার অধিকাংশ স্কুল এবং কলেজে স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের উদ্যোগে সভার আয়োজন করেন মো. শাহজাহান হোসেন। এ সভায় কিশোর গ্যাং, জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং, বাল্যবিয়ে, যৌতুক এবং মাদক প্রতিরোধে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে সকল শিক্ষার্থীদের সরাসরি ফোন করে তথ্য জানানোর অনুরোধ জানান তিনি। আলোচনা সভা শেষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার রিতরন করেন তিনি।

বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবদুস সালাম বলেন, ছাত্রীরাই ইভটিজিং এবং বাল্যবিয়ের শিকার হয়। আমার কলেজের শিক্ষার্থীরা এখন সচেতন। ইভটিজিংয়ের শিকার হলে প্রতিবাদ করছে। বাল্যবিয়ে ভেঙে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কাছে পুলিশের নম্বর আছে। যেকোন প্রয়োজনে তারা পুলিশের সহযোগিতা নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ এর বরগুনার সভাপতি ও বরগুনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন মনোয়ার বলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেনের বিভিন্ন প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ড আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। এ রকম পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্যই কিশোর গ্যাং, জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং, বাল্যবিয়ে, যৌতুক এবং মাদক প্রতিরোধ করে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেনকে নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। এক কথায় বলতে গেলে- তিনি একজন দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ, পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা। তার নানা কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
আরএআর/জেআইএম