সৌদিতে নির্যাতিত মাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ছেলের আকুতি
পরিবারে সচ্ছলতা আনতে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়ে নির্যাতনের শিকার মাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ছেলে। সৌদিতে নির্যাতিত ওই নারীর নাম গোলাপী বেগম (৪৫)। তার বাড়ি ফরিদপুর সদর উপজেলার চানমারী এলাকায়।
বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে করে গোলাপী বেগমের ছেলে মো. হাসান শেখ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাপী বেগমের স্বামী আবু শেখ, মেয়ে স্মৃতি আক্তার ও ননদ নাজমা বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে হাসান শেখ বলেন, সংসারে অভাবের তাড়নায় গত বছরের অক্টোবরের প্রথম দিকে ফরিদপুর সদর উপজেলার তাম্বুলখানা গ্রামের বাসিন্দা ইমদাদুল হক মিলনের মাধ্যমে সৌদি আরব যান মা গোলাপী বেগম। ইমদাদুল হক ঢাকা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক।
তিনি বলেন, ঢাকার পান্থপথের ফেরদৌস টাওয়ারের ৫ম তলায় ইমদাদুলের অফিসে গিয়ে আমরা টাকা পরিশোধ করি। পরে মাকে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। মা বিদেশ যাওয়ার পর আমরা প্রথমে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু কোনোভাবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। হঠাৎ একদিন মা আমার ছোট ভাইয়ের মোবাইলে ফোন দিয়ে বলেন- খুব বিপদে আছি। এই বলেই ফোন কেটে দেন।
পরে আমি ওই নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে ফোনটি বন্ধ পাই। কয়েক দিন আগে হঠাৎ করে মা আমার মোবাইলে কল দিয়ে বলেন, ‘আমি এখানে খুব কষ্টে আছি, আমাকে খেতে দেয় না, নির্যাতন করে। একটি ঘরে আমাকে আটকে রেখেছে।‘ ওই সময়ই আমি মাকে বলি তোমার কাছে মোবাইল আছে সেটা জানতে পারলে ওরা কেড়ে নেবে। তাই তুমি দ্রুত তোমার কথা ভিডিও করে আমাকে পাঠাও। আমার কথামতো কিছু কথা মা ভিডিও করে আমাকে পাঠিয়েছেন। এরপর আর মায়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি।
হাসান শেখ বলেন, ‘আমি ঢাকায় ওই এজেন্সির মালিক ইমদাদুলের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে বলেছি আমার মাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দেন। যত টাকা লাগে আমি দেব। আমাকে একটু সময় দেবেন তার মধ্যে আমি টাকা পরিশোধ করব। প্রয়োজন হলে জামানত হিসেবে আমি চেক দেব। কিন্তু ইমদাদুল আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। সে মাকে দেশে আনতে পারবে না বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগ দেবেন বলে তিনি জানান।’
এ বিষয়ে কথা বলতে ঢাকা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শুধু গোলাপী বেগমই নন, দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন ফরিদপুরের একাধিক নারী। তাদের মধ্যে একজন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার লাবলু সরদারের ১৬ বছরের মেয়ে খাদিজা বেগম। চার মেয়েকে নিয়ে অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে আত্মীয়ের প্ররোচনায় এক মেয়েকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা। এজন্য পাশের গ্রামের আদম ব্যবসায়ী আরিফ ফকিরের কাছে গেলে তিনি ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে ১৫ হাজার টাকা বেতনে খাদিজাকে জর্ডানে গৃহকর্মীর কাজ দেয়ার আশ্বাস দেন।
এতে লাবলু সরদার রাজি হলে তড়িঘড়ি করে গত ১৫ জুন খাদিজাকে জর্ডানে পাঠানোর কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায় আরিফ। দেড় মাস পর খাদিজা তার পরিবারকে ফোনে জানায়, দালালরা তাকে যৌন ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছে, সে কষ্টে আছে, বাঁচতে চায়। এরপর খাদিজাকে ফিরে পেতে তার বাবা মানবপাচার আইনে সদরপুর থানায় মামলা করেন।
প্রতারণার শিকার খাদিজার বাবা লাবলু সরদার বলেন, আমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত পেতে চাই। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই।
গোলাপী ও খাদিজার মতোই দালালের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন জেলার ভাঙ্গা উপজেলার স্বামী পরিত্যক্তা রহিমা বেগম। দুই সন্তান নিয়ে তিনি অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। দালালের প্ররোচনায় পড়ে তিনি বিদেশ যান।
প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার রহিমা বেগম জানান, সংসারের অভাব মোচনের আশায় বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সেখানে ঠিক মতো খাবারও পাইনি। তাদের কথা না শুনলে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রতিনিয়ত। পরে স্থানীয়দের সহায়তার দেশে ফিরে এসেছি। ওখানে এতোদিন থাকলে আমি মারা যেতাম।
ফরিদপুর জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সরকারিভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য গেছেন ১০ হাজার ৬৬০ জন নারী শ্রমিক। যাদের অধিকাংশই গৃহকর্মী। প্রতারক দালালদের দ্বারস্থ না হয়ে সরকারি মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ এই অফিসের।
ফরিদপুর জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের সহকারী পরিচালক ষষ্ঠীপদ রায় বলেন, গোলাপী বেগমের বিষয়টি জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অপ্রশিক্ষিত নারীরাই বিদেশে গিয়ে কাজ করতে সমস্যায় পড়ে। অনেক সময় দেশেও ফেরত আসতে হয়। এজেন্সিগুলো জালের মতো দালালদের ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রতারণা বন্ধে দালালদের রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে আইডি কার্ড দিতে এজেন্সিগুলোকে বাধ্য করতে হবে।
ফরিদপুরের নারী উন্নয়নে কাজ করা সংস্থা বেনিফিসিয়ারি ফ্রেন্ডশিপ ফোরাম সূত্রে জানা যায়, গত ছয় মাসেই দুটি উপজেলাতে (ভাঙ্গা ও সদরপুর) তারা ২৫ জন নারীর সঙ্গে প্রতারণার তথ্য পেয়েছেন। যাদের সবাই দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর বেনিফিসিয়ারি ফ্রেন্ডশিপ ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ফজলুল হাদী সাব্বির জানান, দালালদের মাধ্যমে গিয়ে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়ছে নারীরা। তারা সঠিক কাজ পায় না, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।
প্রতারিত নারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণে সচেতনতার অভাব থাকায় তাদের আইনি সহায়তা দেয়া কঠিন হয় বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্ট। ফরিদপুর ব্লাস্টের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে গেলে ওই ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না, এতে প্রতারণার সম্ভাবনা কম। প্রতারণার পর অধিকাংশ নারীই সঠিক তথ্য ও কাগজপত্র দেখাতে পারেন না। যে কারণে দালালদের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেয়া অনেক কঠিন হয়। গোলাপী বেগমের বিষয়টি ব্লাস্ট দেখবে বলেও তিনি জানান।
বি কে সিকদার সজল/আরএআর/পিআর