‘যতদিন বাঁচব মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখব’
সারাদেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জনমনে বিরাজ করেছে করোনা আতঙ্ক। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না মানুষ। আতঙ্কে আছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও। এমন পরিস্থিতিতেও করোনার ভয়কে উপেক্ষা করে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন ভোলার মনপুরা উপজেলার মাহামুদুর রশিদ ও চরফ্যাশন উপজেলার আরিফ রহমান নামে দুই চিকিৎসক। পরিবারের সদস্যদের উৎসাহে তারা স্বাচ্ছন্দে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসাসেবায় আরও সাহসী উয়ে উঠেছেন। তবে এই দুই চিকিৎসকের গল্প সম্পূর্ণই আলাদা।
ডা. মাহামুদুর রশিদ (৫২)। ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোলার মনপুরা উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। স্ত্রী ইসমত আরা পাপিয়া একজন গৃহিণী। এক ছেলে ফাহাদ বিন মাহামুদ ও এক মেয়ে ফারিহা বিনতে মাহামুদকে নিয়ে তাদের সংসার। ছেলে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে আর মেয়ে দশম শ্রেণিতে ঢাকায় পড়াশুনা করছে। করোনার কারণে তারা সবাই এখন মনপুরায় রয়েছেন।
প্রতিদিনই নানান রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আবার ফেরেন ডা. মাহামুদুর রশিদ। তিনি মনপুরায় যোগদানের পর থেকেই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতাল পরিচালনার ধরন হয়েছে অন্য রকম। ফলে চিকিৎসা সেবা থেকে কোনো মানুষই বঞ্চিত হচ্ছে না। প্রতিদিন সকালে হাসপাতালের সামনে সকল ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত লাইনে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংঙ্গীত পরিবেশন করান। জাতীয় সংঙ্গীত শেষে রোগীদের সততার ও আদর্শের সঙ্গে সেবা প্রদানের জন্য তাদের দিয়ে শপথ পাঠ করান। ইতোমধ্যে তিনি তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য মনপুরাবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এছাড়াও ওই উপজেলায় তিনি গরিবের ডাক্তার হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছেন। ডা. মাহামুদুর রশিদ নিজে একাই মনপুরায় করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করেছেন এ পর্যন্ত ৭৩টি। যার মধ্যে একটি বাদে সব কয়টিই ছিল নেগেটিভ।
ডা. মাহামুদুর রশিদ বলন, আমার বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি কর্মক্ষেত্রে রোগীদের প্রতিও আমার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা যেমন কোনো অভিযোগ করেনি তেমনি রোগীরাও কোনো অভিযোগ করছেন না। ২৩ এপ্রিল মনপুরায় নুরে আলম নামে এক করোনা রোগীর সেবা আমি নিজেই দিয়েছি। আমার পরিবারের সদস্যরা কেউ ভয় পায়নি। বরং তারা আমাকে উৎসাহিত করেছে। তারা ওই রোগীর সুস্থতার জন্য অপেক্ষা করেছে। ওই করোনা আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন এটাই আমার সফলতা।

তিনি আরও বলেন, চাকরি জীবনে অনেক সিরিয়াস রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছি। আমার কাছে টাকার চেয়ে রোগীদের সুস্থ করে তাদের মুখে ফুটে ওঠা হাসিই বড়। চাকরি জীবনে ব্যাংকে টাকার চেয়ে আল্লাহর কাছে গরিব মানুষের অনেক দোয়া জমা রয়েছে। যা হাজার হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশি। মনপুরার গরিব মানুষদের আমরা ঢাকার বড় বড় হাসপাতালের মত চিকিৎসা দিচ্ছি। আমার স্ত্রী আমাকে সব সময় চিকিৎসা সেবায় উৎসাহ দিয়েছে। যতদিন বাঁচবো ততদিন মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখবো।
তার স্ত্রী ইসমত আরা পাপিয়া বলেন, আমার স্বামী যখন করোনা রোগীর চিকিৎসা দেয়ার কথা বলে তখন আমি তাকে হাসি মুখে বলেছি- আবশ্যই তুমি দিবে। তাকে তুমিই সুস্থ করে তুলতে পারবে। আমি সব সময় তার কাজে একমত প্রকাশ করি। আমি জানি সংসারের প্রতি তার যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি রোগীদের চিকিৎসা সেবাও তার দায়িত্ব রয়েছে। আমার ছেলে-মেয়েকেও তাদের বাবার মত একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ করার স্বপ্ন দেখছি। আশা করি আল্লাহ সেই ইচ্ছে পূরণ করবেন।
আরেক চিকিৎসক ডা. আরিফ রহমান (২৮)। তিনি বিসিএস ৩৯ তম ব্যাচের চিকিৎসক। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। ৮ ডিসেম্বর তিনি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইনা সৌদি হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ দিন সম্পর্কের পর এ বছর ১৪ই ফেব্রুয়ারি তিনি খুলনার মেয়ে ডা. আনিকা তাবাসুমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কথা ছিলো এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মহাধুমধাম করে স্ত্রীকে ঘরে তুলবেন। কিন্তু করোনার কারণে তা হলো না। তাতে কোনো দুঃখ নেই ডা. আরিফ রহমানের।
ডা. আরিফ রহমান দক্ষিণ আইচা সৌদি হাসপাতালে যোগদান করেছেন মাত্র ৫ মাস হলো। এর মধ্যে কয়েকবার নিজের বেতনের টাকা দিয়ে অনেক গরিব-অসহায় রোগীর ওষুধ কিনে দিয়েছেন। তরুণ এই চিকিৎসক মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দক্ষিণ আইচা এলাকার মানুষের কাছে গরিবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত লাভ করেছেন। তিনি সহজেই সব রোগীদের সঙ্গে মিলে তাদের দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য সাহস যোগান। এছাড়াও যাদের মধ্যে ওষুধ কিনার টাকা ও বাড়ি যাওয়ার ভাড়া নেই তাদের তিনি নিজের বেতনের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন।
ডা. আরিফ রহমান বলেন, আমি হাসপাতালেই নিজের সাধ্য অনুযায়ী রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি। বাইরে কোনো চেম্বারে বসি না। টাকার চেয়ে মানুষের ভালোবাসাই আমার কাছে বড় সম্পদ। কোনো রোগীকে সুস্থ করে তুলতে পারলেই আমি খুশি। একজন রোগী কারও না কারও সন্তান, কারও বাবা-মা। তাদের নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন। কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সেই স্বপ্নগুলো এলোমেলো হয়। আবার যখন সুস্থ হয়ে ওঠে তখন তাদের মুখে হাসি ফোটে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো করোনা রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে পারেনি। হাসপাতালে প্রতিদিনই নানা রোগে আক্রান্ত রোগী আসছে। আগের মতই অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। দেশের এ পরিস্থিতিতে কোনো ভয় পাওয়া চলবে না। আমি একজন চিকিৎসক, আমার কাজ রোগীদের সেবা দেয়া। সে যে কোনো রোগে আক্রান্ত হোক না কেন তার চিকিৎসা করাই আমার মূল লক্ষ্য।
ডা. আরিফ রহমান বলেন, নতুন বিয়ে করেছি। স্ত্রীকে ঘরে তুলতে পারেনি এতে কোনো কষ্ট নেই। আমার স্ত্রীরও কোনো কষ্ট নেই। আমরা দুজনই জানি এ আঁধার একদিন কেটে যাবে। সুর্য আবার উঠবে। সেদিন নতুন করে সুন্দর বাংলাদেশে ঘর বাঁধবো।
তার স্ত্রী ডা. আনিকা তাবাসুম বলেন, নতুন বিয়ে হয়েছে। এখনও মেহেদির দাগ হাতে রয়ে গেছে। স্বামীর বাড়ি যাওয়া হয়নি। কিন্তু কোনো দুঃখ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার স্বামী কোনো প্রকার ছুটি ছাড়াই কর্মক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালন করছে। এতে আমি খুশি। আমরা দুইজনই ডাক্তার আমাদের প্রধান কাজ রোগীদের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করা। যেদিন বাংলাদেশ করোনামুক্ত হয়ে স্বাভাবিক হবে সেদিনই স্বামীর সংসারে গিয়ে ঘর বাঁধবেন বলে তিনি জানান।
জুয়েল সাহা বিকাশ/আরএআর/পিআর