স্বপ্ন মানে না বাধা
যাতায়াত খরচ দিতে না পারায় বন্ধ হয়েছে ফুটবল খেলার অনুশীলন। দিনমজুর পিতার পক্ষে প্রতিদিন খরচ বহন করা অসম্ভব হওয়ায় ফিঁকে হচ্ছে মারিয়ার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। কাকডাকা ভোরে বাবার ভ্যান গাড়িতে করে ফুটবল অনুশীলনের জন্য আসেন চাঁনমতি। তাদের আত্মবিশ্বাস আর চেষ্টার কাছে যেন হার মানছে দারিদ্রতা। তবে সামাজিক বাধা রয়ে গেছে বরাবরের মতোই।
চুয়াডাঙ্গার মহাতাব উদ্দীন ফুটবল একাডেমি গড়ে উঠেছে ২০২০ সালে। করোনাকালীন সময়ে ঘরবন্দি জীবন থেকে মেয়েদের মুক্ত করতে এ উদ্যোগ নেন সাবেক ফুটবলার মিলন বিশ্বাস। ২৫ জন কিশোরী ফুটবলার নিয়ে একাডেমির যাত্রা শুরু হয়েছে।
মহাতাব উদ্দিন একাডেমির কিশোরী ফুটবলাররা হলেন বিথী, রুপালি, মারিয়া, রুমানা, সিনথিয়া, জুলেখা, তনিমা, বিদিশা, সুরাইয়া, রত্না, কোহিলি, রিভা, সিজ্যাতি, হাফিজা, সাদিয়া, মানিয়া প্রমুখ।
যাদের অনেকেই উঠে এসেছেন অস্বচ্ছল পরিবার থেকে।

চুয়াডাঙ্গা আলোকদিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম মারিয়ার। তিনি রোমেলা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। বাবা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। প্রতিদিন কাজ না থাকলে পড়তে হয় দূর্ভোগে। গ্রাম থেকে চুয়াডাঙ্গায় অনুশীলনে আসতে ৫০-৬০ টাকা লাগে। যাতায়াত খরচ বহন করতে না পারায় বন্ধ রয়েছে প্রতিভাবান কিশোরী ফুটবলারের অনুশীলন।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম চাঁনমতিরও। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন করছেন। বাবার ভ্যানগাড়িতে চড়ে চুয়াডাঙ্গার পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে ছুটে আসেন। আলুকদিয়া হাতিকাটা গ্রামে ছোট্ট একটি খুপড়ি ঘরে মা-বাবা, দাদি, ভাইয়ের সাথে থাকেন চাঁনমতি। পড়াশুনার পাশপাশি সেরা ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
তবে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে চায় না পরিবার ও স্থানীয়রা। নানা প্রতিকূলতা পায়ের নিচে মাড়িয়ে প্রতিদিন মাঠে আসছেন তারা। যারা একসময় ফুটবল খেলতে পারতো না, তারাইএখন বল রিসিভ, শুট, কাটসহ সবকিছুই রপ্ত করে ফুটবলারে পরিণত হচ্ছে। একাডেমি থেকে ফুটবলারদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। প্রতিদিন সকালে কিশোরীরা আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা অনুশীলন করেন।

তবে বেঁচে থাকার জন্য যেখানে দুবেলা অন্ন জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা সেখানে বিলাসিতা। শারীরিক ফিটনেসের জন্য তাদের প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার। এই খাবার তারা সঠিকভাবে পান না।
কিশোরী ফুটবলার মানিয়া বলেন, ফুটবল খেলা গ্রামের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। তারা অনেক খারাপ কথা বলে। সে কারণে মা-বাবা ফুটবল খেলতে নিষেধ করেন। পরিবার থেকে বিয়ের কথা বলতো। কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাই না। পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল খেলতে চাই।
চুয়াডাঙ্গার মনিরামপুর গ্রামের মেয়ে মারিয়া বলেন, বাবা রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। প্রতিদিন কাজ থাকে না। বাড়ি থেকে মাঠে আসতে ৫০ টাকার মত লাগে। সে কারণে মা-বাবা নিষেধ করেছেন ফুটবল খেলতে। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও অভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ছে তা। ফিরতে চাই খেলার মাঠে।

চুয়াডাঙ্গার হাতিকাটা গ্রামের মেয়ে চাঁনমতি বলেন, বাবার ভ্যান গাড়িতে চড়ে মাঠে আসা-যাওয়া করি। মা সংসারে হাল ধরতে কাজ করেন। ভালো পোশাক ও খাবার বাবার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। স্বপ্ন দেখি একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে দেশের হয়ে খেলবো।
ফুটবলার মানিয়ার বাবা আব্দুল মাজিদ বলেন, গ্রামের মানুষ অনেক কথা বলে। তখন খারাপ লাগে। কিন্তু আমি চাই মানিয়া পড়াশোনা আর খেলাধুলা চালিয়ে যাক। কারও কথায় কান দিতে চাই না।
মহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস ফুটবল একাডেমির পরিচালক মিলন বিশ্বাস জানান, অনেক স্বপ্ন নিয়ে একাডেমি করেছি। মেয়েদের খেলার মাঠে নিয়ে আসতে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আর্থিক সঙ্কটের কারণে মেয়েরা নিয়মিত মাঠে আসতে না পারলে কষ্ট হয়। সহযোগিতা পেলে নারী ফুটবলকে এগিয়ে নিতে পারতাম। একাডেমিতে অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে। যারা ঢাকায় খেলতে পারবে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, কিশোরী মেয়েদের নিয়ে ফুটবল একাডেমি গড়ে উঠেছে। পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠটি মেয়েদের খেলার জন্য উপযোগী করা হয়েছে। তাদের আমরা ফুটবল, বুট, জার্সিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করছি। এখান থেকে খেলোয়ার বাছাই করে জেলার জন্য একটি ভালো দল গঠন করতে চাই।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিকুর রহমান বলেন, নারী ফুটবল একাডেমিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। নারীরা খেলার মাঝে থাকুন।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মো. আলী আজগর টগর বলেন, চুয়াডাঙ্গার নারী ফুটবল একাডেমির বিষয়টি টেলিভিশনের সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। বর্তমান সরকার নারীর জন্য কাজ করছে। জেলার মেয়েরা যে ফুটবল খেলতে পারে এতে আনন্দিত। কিশোরী ফুটবলাদের উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
সালাউদ্দীন কাজল/এসএমএম/জেআইএম