ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

চুনিলালের রাজভোগ

জেলা প্রতিনিধি | ব্রাহ্মণবাড়িয়া | প্রকাশিত: ১০:৪৮ এএম, ০৯ জানুয়ারি ২০২১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার প্রত্যন্ত অরুয়াইল বাজারে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রাজভোগ তৈরি করছেন সুনিল মল্লিক ওরফে চুনিলাল। বাইরেরটা দেখতে অন্যসব মিষ্টির মতোই, কিন্তু ভেতরটা নরম-তুলতুলে। মুখে দিলেই মিশে যায়। সম্পূর্ণ ছানায় তৈরি এই রাজভোগ স্বাদে ও মানে অনন্য। আর তাই মহামারি করোনাভাইরাসের দুর্যোগকালেও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন চুনিলালে বিখ্যাত রাজভোগ খেতে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন আসেন চুনিলালের বিখ্যাত রাজভোগ খেতে। অনেকে আবার বিদেশেও নিয়ে যান। তবে চুনিলালের রাজভোগ কেজিতে নয়, বিক্রি হয় পিস হিসেবে। আর প্রতি পিস রাজভোগের দাম ৩৫ টাকা।

অরুয়াইল ইউনিয়নের অরুয়াইল গ্রামের বাসিন্দা চুনিলাল জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় বাজারের মিষ্টান্ন কারিগর গৌরাঙ্গ রায়ের কাছ থেকে মিষ্টান্ন তৈরির কাজ শেখেন। গৌরাঙ্গ রায়ের কাছ থেকে ছানার রাজভোগ তৈরির কৌশল রপ্ত করতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লেগেছে তার।

jagonews24

চুনিলালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে অরুয়াইল বাজারে একটি চায়ের দোকান দেন তিনি। সেই দোকানে কয়েকবছর পর চা, পুরি, সিঙ্গারা বিক্রির পর দোকানে রাজভোগ তৈরি শুরু করেন। ছোট্ট দুই কক্ষের সেই দোকানের একটিতে চলে রাজভোগ তৈরির কাজ, আর অপরটিতে চলে বেচাকেনা।

চুনিলাল মিষ্টান্ন ভান্ডারে রাজভোগ ছাড়া অন্য কোনো মিষ্টান্ন তৈরি হয় না। একেকটি রাজভোগের ওজন দেড়শ গ্রামেরও বেশি। বানানোর পর তিনদিন পর্যন্ত টাটকা থাকে চুনিলালের রাজভোগ। দেশি জাতের গরুর খাঁটি দুধের ছানায় তৈরি এই রাজভোগ খেতে অনেক সুস্বাদু হওয়ায় খুব দ্রুত মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে চুনিলালের রাজভোগের কথা। এখনো রাজভোগ তৈরির জন্য প্রতিদিন বাজারে খুঁজে খুঁজে দেশি জাতের গরুর দুধ কেনেন চুনিলাল। মূলত বানানোর কলাকৌশল এবং দেশি জাতের গরুর দুধের ছানায় তৈরি হওয়ার কারণেই বিখ্যাত হয়ে উঠে চুনিলালের রাজভোগ।

চুনিলালকে দেখে সরাইলের অনেক মিষ্টির দোকানে এখন রাজভোগ তৈরি করা হয়। কিন্তু কোনো দোকানের কারিগরই চুনিলালের মতো রাজভোগ বানাতে পারেন না। প্রথম প্রথম একা মিষ্টি তৈরি করলেও এখন ছেলে গোপাল মল্লিকও বাবার সঙ্গে কাজ করেন। তবে চাহিদা বেশি থাকলেও প্রতিদিন কেবলমাত্র তিনশত পিস রাজভোগই তৈরি করেন পিতা-পুত্র।

jagonews24

চুনিলালের ছেলে গোপাল মল্লিক বলেন, ‘প্রতিদিন তিনশত পিস মিষ্টির জন্য আড়াই মণ দুধ লাগে। এই দুধ থেকে ১৪ কেজি ছানা তৈরি হয়। আমাদের রাজভোগে ৯৯ ভাগ থাকে ছানা আর এক ভাগ থাকে ময়দা। রাজভোগটা যেন ফোলে, সেজন্য সামান্য পরিমাণে ময়দা দেয়া হয়। ভেজালমুক্ত হওয়ায় মানুষ আমাদের দোকানের রাজভোগ খেতে অনেক পছন্দ করেন।’

চুনিলালের রাজভোগ খেতে আসা তরুণ আকরাম মিয়া জানান, মানুষের মুখে এবং ফেসবুকে চুনিলালের রাজভোগের কথা অনেক শুনেছেন তিনি। সেজন্য বন্ধুদের নিয়ে সরাইল উপজেলা সদর থেকে চুনিলালের রাজভোগ খেতে অরুয়াইল বাজারে এসেছেন। চুনিলালের রাজভোগ স্বাদে এবং মানে অন্যসব দোকানে তৈরি রাজভোগের চেয়ে আলাদা বলে জানান তিনি।

রাজভোগ খেতে আসা জাবেদ আল হাসান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের জানামতে ভেজাল কোনো পদার্থ তিনি (চুনিলাল) ব্যবহার করেন না। সেজন্য চুনিলালের রাজভোগের সুনাম সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা বিদেশেও এই রাজভোগ পাঠাই।’

jagonews24

অরুয়াইল গ্রামের সমাজকর্মী মনসুর আলী বলেন, ‘চুনিলালের মতো রাজভোগ কেউই তৈরি করতে পারেন না। রাজভোগের জন্য দুধও অনেক বাছাই করে কেনেন তিনি। তার তৈরি মিষ্টিতে কোনো ভেজাল নেই। অন্যান্য দোকানের রাজভোগের চেয়ে চুনিলালের তৈরি রাজভোগের স্বাদ এবং মান অনেক ভালো।’

চুনিলাল মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী সুনিল মল্লিক ওরফে চুনিলাল বলেন, ‘খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে রাজভোগ তৈরি করি। সেজন্য মানুষ খেতে পছন্দ করে। প্রতি পিস রাজভোগ তৈরিতে আমার ৩০ টাকার মতো খরচ হয়। লাভ কম হলেও মানুষ খেয়ে প্রশংসা করে, এতেই অনেক ভালো লাগে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন আসেন আমার দোকানে। অনেকে আবার বিদেশেও নিয়ে যান।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, ‘খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে তৈরি করায় চুনিলালের রাজভোগ খেতে অনেক সুস্বাদু। এছাড়া বানানোর কলাকৌশলের কারণেও এই রাজভোগের খ্যাতি ছড়িয়েছে সবখানে। শুধু সরাইেই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জন্য একটি ঐতিহ্য চুনিলালের এই রাজভোগ।’

আজিজুল সঞ্চয়/এসআর/এমএস