ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

বোঝার উপায় নেই বঙ্গমাতা ও রাসেলকে নিয়ে এখানেই ছিলেন বঙ্গবন্ধু

জেলা প্রতিনিধি | টাঙ্গাইল | প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ০১ এপ্রিল ২০২১

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত টাঙ্গাইল বন বিভাগের মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা এলাকায়। বরং অযত্ন-অবহেলায় বন বিভাগের দোখলা রেস্ট হাউসটি ভিভিআইপিদের অবকাশ যাপনের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ডাল-পালা কেটে ফেলার পর এখন মৃতপ্রায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নিজহাতে লাগানো আমগাছটি।

জানা যায়, টাঙ্গাইল শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তর দিকে মধুপুর গড়াঞ্চলের অরণখোলা মৌজায় দুটি খালের মিলনস্থলই ‘দোখলা’ হিসেবে পরিচিত। মধুপুর বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের চারণভূমি দোখলা এলাকা। মধুপুরের পীরগাছা ও থানার বাইদ এলাকা থেকে পৃথক দুটি খাল এসে অরণখোলা মৌজায় এসে একীভূত হয়েছে- যা কালক্রমে দোখলা এলাকা হিসেবে পরিচিত।

বন পরিদর্শনকারী ভিআইপিদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ ও বিশ্রামের জন্য দোখলায় বন বিভাগ একটি রেঞ্জ ও বিট অফিসারের দুটি কার্যালয় এবং ১৯৬২ সালে দোখলা রেস্ট হাউস স্থাপন করে। তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নরসহ বহু ভিআইপিরা মধুপুরের গহীন বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে এসে দোখলা রেস্ট হাউসে অবস্থান করেছেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব তাদের ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে নিয়ে বিশ্রামের জন্য বনের মাঝে নিরিবিলি ও নিরাপদ দোখলা রেস্ট হাউসে যান।

১৯৭১ সালের ১৮ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত দোখলা রেস্ট হাউসে অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধু স্থানীয় আদিবাসীদের তাদের জীবনমান ও পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হতে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে বলেন। তিনি স্থানীয় চুনিয়া গ্রামের আদিবাসী গারো রাজা পরেশ চন্দ্র মৃ- এর বাড়িতে গিয়ে মধুপুর বনাঞ্চল সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মতবিনিময় করেন।

তিনি চুনিয়া গ্রামের গারো রাজার সঙ্গী জগদীস নকরেক ওরফে জনিক নকরেক ও দোখলার মোশারফ হোসেনসহ অনেকের সাথেই তৎকালীন আন্দোলন-সংগ্রামের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মধুপুর বন ও বনে বসবাসরত আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে সব সময় পাওয়া যাবে বলে অঙ্গীকার করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু দোখলায় থাকাকালে প্রতিদিন স্থানীয়দের সঙ্গে দেখা করলেও দোখলা ডাকবাংলোতে রাতযাপন করেছেন। বাংলোতে তিনি যে চেয়ারটিতে বসতেন ও টেবিল ব্যবহার করেছেন, তা যত্ন করে রাখা হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা এবং ছোট্ট শেখ রাসেলের স্মৃতিধন্য দোখলা-রসুলপুর ৭ (সাত) কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি মহান স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ হয়নি। দোখলা রেস্ট হাউসটির সামান্য সংস্কার করা হলেও তা আধুনিক নয়। বন বিভাগের রেঞ্জ ও বিট কার্যালয় দুটিরও কোনো উন্নয়ন হয়নি।

এছাড়াও জাতির পিতার নিজ হাতে লাগানো আম গাছটির ডালপালা প্রায় দুই বছর আগে কেটে ফেলায় পরিচর্যার অভাবে ও অযত্ন-অবহেলায় এখন মৃতপ্রায়। বন বিভাগের দোখলা রেস্ট হাউসের পরিদর্শন বইয়েও বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের কোনো প্রমাণই রাখা হয়নি।

এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনাকালে ড. কামাল হোসেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, তোফায়েল আহমেদসহ বিভিন্ন গুণীজন দোখলা রেস্ট হাউসে অবস্থান করেন। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল ১৯৭৪ সালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনে এসে দোখলা রেস্ট হাউসে অবস্থান করেন।

স্থানীয়দের ধারণা, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশে কলঙ্কিত অধ্যায় শুরু হয়। দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় জাতির পিতার সে সময়ের সব স্মৃতি সুকৌশলে মুছে ফেলা হয়েছে।

jagonews24

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছার স্মৃতিধন্য টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চলের আদিবাসী গ্রাম চুনিয়ার শতবর্ষী জগদীস নকরেক ওরফে জনিক নকরেক এখন বয়সের ভারে ন্যূব্জ। স্মৃতি লোপ পেয়েছে তার। কথা বলতে গিয়ে অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলেন।

তারপরও স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, তাকে আমরা আর না পেলেও তার স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। দোখলা রেস্ট হাউসের পাশে তিনি একটি আম গাছ লাগিয়েছিলেন।

জনিক নকরেক জানান, বঙ্গবন্ধু ক্লান্তি কাটাতে দোখলায় বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন। ঢাকার কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলেন। হয়ত খুব বেশি লোককে জানাননি কোথায় আছেন।

তিনি জানান, গারো রাজা চুনিয়া গ্রামের পরেশ চন্দ্র মৃকে বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে চিনতেন। বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতা ছেড়ে আসেন, তার বছর দুয়েক আগে পরেশ মৃ কলকাতায় গিয়েছিলেন। পরেশ চন্দ্র মৃ দেশভাগের কিছুদিন পর কলকাতা থেকে মধুপুরের চুনিয়ায় ফিরে আসেন। ফিরে এসেই গারোদের জুমচাষ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন।

জনিক নকরেক আরও জানান, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরেশ বাবুর বাড়িতে নানা কিছু নিয়েই কথা হয়েছিল। তিনি কথা দিয়েছিলেন- বন রক্ষা করবেন। বনের মানুষের লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গে থাকবেন।

জনিকের দাবি, বঙ্গবন্ধু সেদিনই বলেছিলেন দেশটা স্বাধীন হয়ে যাবে। স্বাধীন দেশে হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-গারোতে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। সবাই ভাই ভাই হয়ে বসবাস করবে।

পরেশ চন্দ্র মৃর একটি আত্মজীবনীমূলক রচনায় জানা যায়, তার আমন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আদিবাসী গ্রাম চুনিয়ায় এসেছিলেন।

পরেশ চন্দ্র মৃ’র ছেলে বাবুল দারু জানান, বাবার কাছে এটা ছিল একটা গৌরবের স্মৃতি।

ষাটোর্ধ্ব বাবুল দারু জানান, তখন তার বয়স ছিল ১২-১৩ বছর। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফজিলাতুননেছা এবং শেখ রাসেলও ছিলেন। তিনি খুব কাছ থেকে তাদেরকে দেখেছিলেন। তারা খুব সাদাসিধে ছিলেন। তার মায়ের হাতে তাদের গাছের পান খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছিলেন। তার মা দীলিপ জর্দা দিয়ে পান বানিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজে চেয়ে নিয়েছিলেন তাদের গাছের পান। তাদেরকে মধুপুরের আনারসও খেতে দেয়া হয়েছিল।

মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ও শোলাকুড়ি ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের ধারণা, বঙ্গবন্ধু হয়ত কয়েকটা দিন একান্তে বিশ্রাম নিতে দোখলা রেস্ট হাউসে উঠেছিলেন।

ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মধুপুর অঞ্চলের সভাপতি উইলিয়াম দাজেল জানান, মহান স্বাধীনতার পর একটা দীর্ঘ সময় স্বাধীনতা বিরোধীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় বন বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতির পিতার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।

শোলাকুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্কুলের ছাত্রদের নেতৃত্বে ওই বাংলোতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে মহান নেতা পাইপ হাতে হাসিমুখে বাংলোর সামনের লনে এসে দাঁড়ান। উপস্থিত ছাত্ররা তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করলে তিনি ধমক দিয়ে বলেন, স্যার নয়, ভাই বলে ডাকো।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার ভ্রমণের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য টাঙ্গাইল বন বিভাগ দোখলা ভিভিআইপি ডাকবাংলো চত্বরে শ্বেতপাথরে খোদাই করা একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেছে। এটিই শুধু মধুপুর বনাঞ্চল পরিদর্শনে আসা পর্যটক ও বনভোজনকারীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।

টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডক্টর মো. জহিরুল হক জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য দোখলা রেস্ট হাউসটি আংশিক সংস্কার করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে রেস্ট হাউসের কাছে একটি অত্যাধুনিক ডাকবাংলো নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।

আরিফ উর রহমান টগর/এফএ/এমকেএইচ