পর্যটকদের গান শুনিয়ে পেটের খোরাক
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বাসিন্দা শরিফ মিয়া ও আমির হামজা। তাদের একজনের বয়স ১০ ও আরেকজনের ৯ বছর। যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা বই-কলম, সেই বয়সে কচি হাতে ধরেছে নৌকার বৈঠা। টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া পর্যটকদের মরমি কবি হাছন রাজা ও বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান শুনিয়ে যে টাকা পায় সে টাকা দিয়েই তাদের সংসার চলে।
সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, শরিফ পর্যটকদের হাছন রাজার ‘লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি ভালা নাই আমার’, অন্যদিকে আমির হামজা শাহ আবদুল করিমের ‘বন্দে মাইয়া লাগাইছে/পিরিতি শিখাইছে/দেওয়ানা বানাইছে/ কি যাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে’ গান গেয়ে শোনাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে শুনছেন শ্রোতারা।
শরিফ মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার বাবার নাম আলিম উদ্দিন। সে টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের গোলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। প্রতিদিন ভোর ৬টায় পান্তা ভাত খেয়ে ছোট নৌকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশে রওনা দেয়। প্রায় ১৫ মিনিট নৌকা চালিয়ে হাওরে এসে পৌঁছায়।
শরিফ জানায়, তার বাবা অসুস্থ, সংসার চালানোর মতো কেউ নেই। কিছু জায়গা ছিল, সেগুলো বিক্রি করে বাবার চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু বাবা আগের মতো কাজ করতে পারেন না। বাবার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন, তাই চড়া সুদে টাকা এনে ছোট এই নৌকাটি কিনেছি।
শরিফ জাগো নিউজকে বলে, ‘আমি ছোটবেলায় বাবার মুখ থেকে প্রথম হাছন রাজার গান শুনি। পরে আরও অনেকগুলো গান মুখস্থ করি। এখন সেই গানগুলো গেয়ে যে টাকা রোজগার করি তা দিয়ে বাবার চিকিৎসা ও সংসার চলে।’
যে চড়া সুদে শরিফ নৌকাটি কিনেছিল, সেই টাকাও সে ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছে। এখন সে নিজেই নৌকার মালিক।
আমির হামজার বাড়ি হাওরপাড়ের সিলানী তাহিরপুর গ্রামে। তার বাবার নাম কালা মিয়া। বাবা, বড় বোন ও মাকে নিয়ে তাদের সংসার। সে শাহ আবদুল করিমের গান গেয়ে সংসার চালায়।
আমির হামজা বলে, ‘অনেক স্বপ্ন ছিল একদিন বড় একজন শিল্পী হবো। আমার বাবা-মা আমাকে স্কুলে ভর্তিও করে দিয়েছিল। পরে আমি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করার সুযোগ পেয়েছি। এখন পর্যটকদের গান শুনিয়ে সংসার চালাই।’
দাদার কাছ থেকে শুনেই বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান আয়ত্ত করেছে শিশু আমির হামজা। দাদা মারা যাওয়ার পর তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
‘বড় বোনকে বিয়ে দেয়ার সময় বাবা চড়া সুদে টাকা এনেছিলেন। সেই টাকা ফেরত দিতে গিয়ে আমাদের সংসার চলছিল না। ঠিক তখন একটি ছোট নৌকা ভাড়া নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে আসি এবং দাদুর শেখানো গান পর্যটকদের শোনাতে থাকি। এ থেকে যে টাকা পাই তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে’—যোগ করে শিশু আমির হামজা।
সে এ প্রতিবেদককে বলে, ‘স্যার, সবার ভাগ্যে সব কিছু থাকে না। বড় শিল্পী হতে পারিনি তাতে কী! জীবনের শিল্পীতো হতে পেরেছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
এই দুই শিশুর গান শোনেন পর্যটক বিজয় আহমেদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজকে অভাবের কারণে দুটি সুন্দর প্রতিভা নষ্ট হয়ে গেল। আমি মনে করি, হাওরের প্রতি সরকারকে আরও বেশি করে নজর দেয়া উচি।’
পর্যটক মামুন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাওরে এসে এতো সুন্দর কণ্ঠে গান শুনতে পারব কল্পনাও করতে পারিনি। ধন্যবাদ শরিফ ও আমির হামজাকে এতো সুন্দর গান শোনানোর জন্য।’
লিপসন আহমেদ/এসআর/এমএস