তিস্তার পেটে ১০০ একর জমি, শেষ সম্বল ভিটে হারানোর শঙ্কায় শফিকুল
‘বাড়ি একটাই আছিল, নদী ভাইংতে ভাইংতে বাড়ির বগলোত আইচ্চে। এহন অন্যের জাগাত আচি। সেটাও থাকপের দেয় না, হামরা যামো কোনটাই, এহন নিরুপেয়।’

এভাবেই নদী ভাঙনে শেষ সম্বল ভিটে হারানোর শঙ্কার কথা বলছিলেন তিস্তাপাড়ের দিনমজুর শফিকুল ইসলাম (৩৫)। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরের বজরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের পশ্চিম বজরা গ্রামে। বাবার নাম মহসিন আলী।
শফিকুল জানান, তিনি নিজে এখন দিনমজুর করে জীবিকা নির্বাহ করলেও একসময় তাদের অনেক জমি ছিল। তার বাবা মহসিন আলী ১০০ একর জমির মালিক ছিলেন। নদী ভাঙনে সেসব জমির সবই এখন তিস্তার পেটে। এখন শেষ সম্বল এ ভিটে। এবারের ভাঙনে ভিটে হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তার।

সরেজমিন বজরা ইউনিয়নের পশ্চিম বজরা গ্রামে দেখা যায়, তিস্তা নদীর তীরবর্তী বেশকিছু ঘরহীন ধাপড়ি পড়ে থাকার চিত্র। তার পাশে দাঁড়িয়ে দিনমজুর শফিকুল ও তার প্রতিবেশী মোজাফফর হোসেন এবং তাদের পরিবার। ৭টি পরিবার সেখানে আশ্রয়ের আশায় এসেছেন। তবে জমির মালিক সেখানে তাদের থাকতে দিতে রাজি নয়।
ভাঙনে ঘর হারানো একই গ্রামের মৃত নুরু মিয়ার স্ত্রী রাশেদা বেওয়া বলেন, ‘বছরে বছরে নদী ভাঙে, হামরা মাইনসের জাগাত য্যায়া থাকি। ফির ওই যে ঘরের পিছনোত একটা খাল পইড়ছে, পানি আইলে খুবই অসুবিদে হয়, মাইনসের জাগাত য্যায়া বছরে বছরে থাকা নাগে, এ বছরও নদীর পানি বাড়ায় একটা ঘর ভাংগি নিয়্যা মাইনষের জাগাত য্যায়া নিন্দ পাইরব্যার নাগছি। আরও একটা ঘর ভাইংবের আছে।’

বৃদ্ধা রাশেদা বলেন, ‘হামরা চাউল, ডাইল চাইনে, হামাক নদীটা বান্দি দেউক, হামরা নিজের জাগাত আসি শান্তিমতো নিন্দ পাইরমো।’
ভাঙনের শিকার একই গ্রামের অপর তিন সহোদর ইদ্রিস আলী, ইউনুছ আলী ও সোলায়মান আলী জানান, বাবা যে জমি রেখে গিয়েছিলেন, তা থেকে ভাইয়েরা প্রতিজন এক একর করে ভাগ পাইছিলাম। তিন ভাইয়ের তিন একর সম্পত্তির ৭০-৭৫ ভাগ এখন তিস্তার পেটে বিলীন। অবশিষ্ট অংশ এবার যাবে হয়তো।

ইদ্রিস আলী বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে নদীতে পানি বাড়ছে, ভাঙনও বাড়ছে। যেকোনো সময় বসতভিটে বিলীন হয়ে যাবে। নদী ভাঙনের শব্দে রাতে পরিবার নিয়ে আতঙ্কে নির্ঘুম কাটছে।’
তার ভাই ইউনুছ আলী বলেন, ‘এবার নিয়ে পাঁচবার বাড়ি সরিয়েছি। যত দূরে এসে বাড়ি করি, তবুও ভাঙনের কবলে পড়ি। এ থেকে আমাদের রক্ষা নেই।’

তারা জানান, প্রায় ২০ বছর আগে সিএলপির ত্রাণ পেয়েছিলেন তারা। এছাড়া আর কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। তবে তারা এখন ত্রাণ চান না, নদীরক্ষা বাঁধ চান।
জানা গেছে, বৃষ্টির পানি ও উজানের ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চর নাখেন্দা দিয়ে প্রবেশ করে রাজারহাট, উলিপুর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারীর ব্রক্ষ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। যার দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। ফলে জেলার ১৬টি এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে।

ভাঙন কবলিত এলাকাগুলো হলো—গতিয়াসাম, চতুরা, বুড়িগ্রামহাট, কালীরহাট, গাবুর হেল্লা, মেদনীপুর, বিদ্যানন্দ, উলিপুরের ঠুটাপাইকোর, দলদলিয়া, থেতরাই (গোড়াই পিয়ার) নাগরাকুরা, পশ্চিম বজরা, হোকডাঙ্গা, অজুনের পাড়, দাঁড়িয়ার পাড় ও চিলমারী কাশিম বাজার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিস্তা সেতু থেকে চিলমারী পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের শঙ্কায় রয়েছে নদীপাড়ের মানুষ।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার বলেন, নদীগর্ভে বসতবাড়ি হারানো পরিবারের তালিকা করে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেয়া হয়েছে। প্রথম দফায় ১ হাজার ৫৪৯টি ও দ্বিতীয় দফায় ১ হাজার ৭০টি পরিবারকে ঘর দেয়া হয়। এবার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে তাদের জন্যও ঘরের ব্যবস্থা করা হবে।
মো. মাসুদ রানা/এএএইচ/জেআইএম