ঈদ নেই সুন্দরবননির্ভর শত শত মুসলিম জেলে পরিবারে
‘গেল বছর কয়েকজন মিলে ভাগি হয়ে গরু কোরবানি করেলাম, এবার কোরবানি করতি (করতে) পারলাম না। তুমার চাচীরে একখান শাড়ি কিনে দিছি। আমার যন্নি কিছু কিনতি পারিনি, আগের বছর আম্পান হুইল (হয়েছিল) সেকুন (সে সময়) ঘরের চাল উড়ে গেল। দোকানতে টিন বাকিতি নে ঠিক করিলাম। এখনো সেই টাকা শোধ করতি (করতে) পারিনি। ক’দিন আগে ইয়াস ঝড় হুয়ে ঘেরডাও ভেসি গেছে। তাতি আবার করোনার যন্নি লকডাউন ছেল দেড়মাস, এখন জঙ্গলেও যেতি দিতে না। আয় ইনকাম নি (নেই)। ইচ্ছা থাকলিও এবার কোরবানি করতি পারব না।’ ভারী কণ্ঠে কথাগুলো বলেন, সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা বনজীবী আজিজ গাজী।
একই এলাকার মৌখালী গ্রামের মালঞ্চ নদী পাড়ের বাসিন্দা জেলে আকবার আলী বলেন, ‘আমি জঙ্গল করে সংসার চালাই। ছোট ভাইডা মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালায়, দেড়মাস ধরে লকডাউন চলতেছে। গাড়ি বের করতি পারে না। সেও এখন আমার সংসারে। মা-বাবাসহ আমার বাড়ি প্রতিদিন ১২ জনের রান্না করতি হয়। এখন সুদের টাকায় বসে বসে খাচ্ছি। যাহয় দুডো মাছ ধরে খেতাম তাও এখন বন্ধ। গত মাস থেকে সুন্দরবনে ঢুকতি দেচ্ছে না। এখনও একমাস পরে পাস দেবে। এখন তিন বেলা ঠিকমত খাবার জুটতেছে না। কোরবানির চিন্তা করব কিম্মাই (কেমন করে)।’
তাদের মতোই, সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জনপদের শত শত মুসলিম জেলে পরিবার এবারের ঈদুল আজহা’র আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত কাঁকড়া ও মাছের প্রজনন মৌসুমের কারণে জেলেদের বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। ফলে সুন্দরবন থেকে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে পারছেন না জেলেরা। এতে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন বনের ওপর নির্ভরশীল শত শত জেলে পরিবার। সুন্দরবন সংলগ্ন কয়েকটি জেলে পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে এবারের ঈদে তাদের মধ্যে কোনো উন্মাদনা নেই।

তবে এই তিন মাস সরকারিভাবে জেলে কার্ডধারীদের মাসিক ৪৭ কেজি করে চাল দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয় না বলে অভিযোগ জেলেদের।
গাবুরা ইউনিয়নে সোরা গ্রামের মৎস্যজীবী ইউনুস গাজী জানান, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে তারা প্রতি গোনে (এক পক্ষ) ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু জেলে কার্ডে মাঝে মাঝে চাল পাওয়া যাচ্ছে। এ চালে তাদের সংসার চলছে না।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে আম্পান, ইয়াস পরবর্তী সময়ে বেড়ি বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরিবারগুলো এখনো সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইউনিয়নের বেশিরভাগ গরিব মানুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে অর্থকষ্টের কারণে এবার অনেকে কোরবানি করছেন না। এতে গরিবরা মাংস খাওয়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। তবে ঈদ উপলক্ষে পরিষদ থেকে গরিব পরিবার পিছু ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।’
শ্যামনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তুষার মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশের জেলেদের জন্য বরাদ্দ আসলে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এসব চাল জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হয়। শুধুমাত্র সুন্দরবনের জেলেদের জন্য আলাদাভাবে চাল বরাদ্দ না থাকায় এখন চাল দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি একটু জটিল।’
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) এম এ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরো পশ্চিম সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য। অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ নিষেধ। তাছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত হওয়ায় বর্তমানে মাছ ও কাঁকড়ার পাস-পারমিট বন্ধ রয়েছে। এজন্য বৈধভাবে জেলেরা বনে ঢুকতে পারছেন না। সেপ্টেম্বর মাসে আবার পাস-পারমিট চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
আহসানুর রহমান রাজীব/এসএইচএস/জেআইএম
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ বাঞ্ছারামপুর ইউএনও ফেরদৌস আরার ইন্তেকাল
- ২ ছয় বছরেই ব্যবহার অনুপযোগী দুই গুচ্ছগ্রামের শত পরিবারের বাসস্থান
- ৩ শিশির মনিরের নির্বাচনি সভায় বক্তব্য দিলেন সাবেক আ’লীগ নেতা
- ৪ স্ত্রীর স্বীকৃতি দাবিতে সন্তানদের নিয়ে ইউপি সদস্যের বাড়িতে ২ নারী
- ৫ আপিলেও ফেরেনি বিএনপির আইয়ুবের প্রার্থিতা, বৈধ হয়েছে ছেলের মনোনয়ন