লাইফ বয়া-অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও নেই চিকিৎসা ব্যবস্থা
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নদীপথ। লঞ্চে ঢাকা থেকে হাতিয়া যেতে সময় লাগে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা। এসময় যাত্রীদের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি এই রুটে চলাচলের সময় বিনা চিকিৎসায় একজনের মৃত্যু হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৮ আগস্ট উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা যাওয়ার পথে লঞ্চে মৃত্যু হয় ঝর্না বেগম নামে এক গৃহবধূর। তিনি হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের জোড়খালী গ্রামের বাসিন্দা।
ঝর্নার স্বামী ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, অসুস্থ স্ত্রী ঝর্না বেগমকে নিয়ে গত ২৮ আগস্ট ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। দুপুর ১২টায় তাদের বহনকারী লঞ্চটি তমরদ্দি ঘাট ছেড়ে যায়। পরদিন সকালে ঢাকায় নেমে স্ত্রীর উন্নত চিকিৎসা করানোর ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু রাত ১২টার পর তার স্ত্রীর অবস্থা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে যায়। দেখা দেয় প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। এসময় মোবাইল ফোনে ঢাকার একটি হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে ঝর্না বেগমকে অক্সিজেন সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু লঞ্চের মধ্যে অক্সিজেন ব্যবস্থা না থাকায় তার স্ত্রীর অবস্থা আরও খারাপ হয়। শেষ পর্যন্ত রাত ২টার সময় লঞ্চের মধ্যেই মারা যান ঝর্না বেগম। পরদিন সকালে সদরঘাটে নেমে অ্যাম্বুলেন্সে মৃত স্ত্রীকে নিয়ে সড়ক পথে চেয়ারম্যান ঘাট হয়ে আবার হাতিয়া ফেরত যান তিনি।
শুধু জসিম উদ্দিনের স্ত্রী নয়। একই ভাবে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি লঞ্চে মারা যান হাতিয়া পৌরসভার সাত নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলী আফরোজ খাঁন নোহেল।
নোহেল খাঁনের ভাই আলী মর্তুজা খান সোহেল জানান, তার ভাইয়ের হার্টে সমস্যা ছিল। নিয়মিত ডাক্তার দেখানোর জন্য ঢাকায় যেতে হতো। ঘটনার দিন সকালে একই রুটে চলাচল কারী এমভি ফারহান-৩ লঞ্চে করে ঢাকা রওনা হন তিনি। লঞ্চটি চাঁদপুর পার হওয়ার পরই তার ভাইয়ের বুকে ব্যথা শুরু হয়। কিন্তু লঞ্চের মধ্যে কোনো ডাক্তার ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা না থাকায় রাত আড়াইটার দিকে তার ভাই মারা যান।

জানা যায়, প্রতিদিন ঢাকা সদরঘাট থেকে হাতিয়ার তমরুদ্দি ঘাট পর্যন্ত দুটি লঞ্চ চলাচল করে। এগুলো ঢাকা থেকে বিকেল ৫টায় ছেড়ে পরদিন সকালে হাতিয়া পৌঁছে। তবে দীর্ঘ সময় লঞ্চে থাকা অবস্থায় রোগীদের দেখার জন্য নেই কোন ডাক্তার বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী মেডিকেল কর্মকর্তা বিমান চন্দ্র আচার্য্য বলেন, দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় যাওয়া এই রুটটি রোগীদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারন লঞ্চের মধ্যে কোনো ডাক্তার বা অক্সিজেন সরবারহের ব্যবস্থা নেই। উন্নত চিকিৎসা নিতে হাতিয়ার বাইরে যাওয়া রোগীদের এই রুটটি ব্যবহার না করার জন্য বলে হয়ে থাকে।
ঢাকা-হাতিয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চ এমভি ফারহান-৩ এর মাস্টার মো. বজলুর রহমান জানান, লঞ্চের মধ্যে জীবন রক্ষার সরঞ্জামের মধ্যে লাইফ বয়া, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র, কিছু প্যারাসিটামল কিছু বমির ওষুধ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার একটি বক্স ছাড়া কিছুই নেই। হাতিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর লঞ্চে থাকা কোনো রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তাদের তীরে নামিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আর চাঁদপুর পার হয়ে গেলে তাও সম্ভব হয় না। কারণ গভীর রাতে ঘাটে ভেড়ানোর মতো কোনো জায়গা পথে নেই।
হাতিয়াসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের দ্বীপ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘উপকূল বাঁচাও আন্দোলনের’ (উবা) সভাপতি শাহেদ শফিক বলেন, হাতিয়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত দীর্ঘ নদীপথ অতিক্রম করতে যাত্রীবাহী এসব লঞ্চে একটি করে মেডিকেল টিমসহ কিছু উপকরণ রাখা প্রয়োজন।
হাতিয়া-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ফেয়ারী শিপিং লাইন্স লিমিটেডের তত্ত্বাবধায়নে চলা এম ভি তাসরিফ লঞ্চের মালিক হাফেজ ইব্রাহীম বলেন, মেডিকেল টিম দেওয়া না গেলেও প্রতিটি লঞ্চে দুটি করে অক্সিজেন সিলিন্ডার দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এছাড়া লঞ্চের কর্মচারীদের অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ইকবাল হোসেন মজনু/ এফআরএম/এএসএম