ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ফোনেই জানানো হয় বাকির কথা, ছাপানো হয় না হালখাতার কার্ড

এন কে বি নয়ন | ফরিদপুর | প্রকাশিত: ০৯:২৫ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২২

ফরিদপুরে এখন আর হালখাতার সেই চিরচেনা রূপ দেখা যায় না। ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। হালখাতার কার্ড বিতরণের পরিবর্তে চালু হয়েছে মোবাইলে মেসেজ দেওয়ার প্রচলন। আগের মতো লাল রঙের টালিখাতা, রঙিন কাগজ, মাটির হাঁড়ি, কলাগাছ দিয়ে দোকান সাজাতে দেখা যায় না। ফরিদপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এখন আর হালখাতা নেই বললেই চলে। অনেকটা বিলুপ্তির পথে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হালখাতা উপলক্ষে আগে দোকানে দোকানে মিষ্টি বিতরণ করা হতো। কোনো ক্রেতা দোকানে এলেই আগে প্লেটে করে দেওয়া হতো মিষ্টি। ক্রেতারা সারা বছরের পুরোনো হিসাব-কিতাব পরিশোধ করতে আসতেন। ক্রেতাদের জন্য দোকানে রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, সন্দেশ, বুন্দিয়াসহ নানা বাহারি মিষ্টি, নিমকি ও ফলের আয়োজন থাকতো।

মহাজনরা দোকান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে কলাগাছ, মাটির হাঁড়ি, রঙিন কাগজ দিয়ে সাজাতেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা দোকানে সিঁদুরের ফোটা দিতেন। গদিতে নতুন পাটি বিছানো হতো। নতুন বছরের জন্য নতুন হিসাবের খাতা খোলা হতো।

একদিন পরেই পহেলা বৈশাখ, হাতের নাগালে হালখাতা। ফরিদপুরের ৯টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে দেখা যায়, পহেলা বৈশাখে হালখাতা উপলক্ষে কোথাও কোনো আয়োজন নেই।

jagonews24

বোয়ালমারী বাজারের হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী কুমারেশ কুন্ডু জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন আর হালখাতার সেই যুগ নেই। কালের বিবর্তনে সব যেন উল্টে-পাল্টে গেছে। এখন হালখাতায় আগের মতো জমজমাট হয় না।’

প্রদীপ মেশিনারিজের মালিক পরিতোষ বালা জাগো নিউজকে বলেন, ৪০ বছর আগে যেমন হালখাতার আয়োজন করতাম, এখনো দোকানে হালখাতা করি কিন্তু ভিন্নভাবে।

তিনি বলেন, এখনকার হালখাতায় আগের মতো জৌলুস নেই। এখন সবাই টাকা-পয়সার কথা চিন্তা করে। মানুষে মানুষে বিশ্বাসও উঠে গেছে। ১০ জনকে বাকি দিলে আটজন টাকা ফেরত দেয়, দুজন উধাও হয়ে যায়।

ফরিদপুর শহরের বেশ কয়েকজন খাতাপত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন কয়েক ধরনের লাল রঙের হিসাবের খাতা বাজারে চালু আছে। এসব খাতার দামে যেমন পার্থক্য রয়েছে নামেও রয়েছে চমক। যেমন লালসালু টালির দাম ১৩০ টাকা, জাবেদা খাতা ৩৩০ টাকা, খতিয়ান খাতা ২২০ টাকা, হাতছিটা খাতা ১২০ টাকা, হাফ টালি ৬০ টাকা, স্পেশাল ব্রাউন বুক ১২০ টাকা।

jagonews24

দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে লালখাতা তৈরি করে আসছে বোয়ালমারী পৌর সদরের সালামিয়া আর্ট প্রেস। এর মালিক রফিকুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে মানুষ আস্তে আস্তে হালখাতা ব্যবহার থেকে সরে আসছে। যত দিন যাচ্ছে হালখাতার ভবিষ্যত ততই অন্ধকার। হালখাতাকে ঘিরে বাণিজ্যিকভাবে এখন তৈরি হচ্ছে বিশেষ হালখাতা কার্ড। এ কার্ড দিয়ে দোকানিরা হালখাতায় ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানান।’

সুলতান প্রিন্টার্সের মালিক সুলতান আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে হালখাতার কার্ড ও খাতাপত্র তৈরির কাজ করি। কিন্তু আগের মতো হালখাতার চাহিদা নেই।’

ফরিদপুর শহরের হামিম প্রিন্টিং প্রেসের মালিক হাবিবুর রহমান কামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে হালখাতার কার্ড তৈরির কাজ করতাম। এখন এসব কাজের অর্ডার নেই। কাজকর্মের অভাবে বসে আছি।’

তিনি বলেন, এখন আর কেউ টাকা খরচ করে কার্ড ছাপান না। মোবাইলে মেসেজ দিয়ে বা কল করে জানিয়ে দেন, ‘আপনার এত টাকা বাকি আছে, পহেলা বৈশাখে পরিশোধ করে দিয়েন আর মিষ্টিমুখ করে যাবেন’।

সুকতারা মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক গুপিনাথ পাল, সূর্যমুখী মিষ্টান্নের সুকুমার সাহা, আপ্যায়ন মিষ্টান্ন ভান্ডারের বিজয় সাহা জানান, আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হার্ডওয়্যার ব্যাবসায়ী, কাপড় ব্যবসায়ী, স্বর্ণ ব্যবসায়ী, পান ব্যবসায়ী, কাঁচামাল ব্যবসায়ী, আড়তদার, মুদি দোকানিরা সাধারণত হালখাতার জন্য মিষ্টির অর্ডার দিতেন। কিন্তু এখন আগের মতো অর্ডার নেই। বেচাকেনাও নেই।

২০ বছর ধরে স্টেশনারি দোকানের ব্যবসা করেছেন বাকের ইদ্রিস। হালখাতা উপলক্ষে প্রতিবছর বেচাকেনাও বেশ হতো। এখন আগের মতো ব্যবসা নেই বলে তিনি এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।

jagonews24'

তবে আগের মতো জমজমাট না থাকলেও বাংলা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে হালখাতা যুগের পর যুগ টিকে থাকবে বলে মনে করেন ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে পহেলা বৈশাখে হালখাতা উৎসব শুরু হয়। হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথমদিন ব্যবসায়ীদের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। সে সময় প্রজারা খাজনা পরিশোধ করতেন চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত। পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানোর পাশাপাশি আনন্দ-উৎসব করতেন।’

ঢাকা সাহিত্য পরিষদের নির্বাহী সভাপতি কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জায়েদ হোসাইন লাকি জাগো নিউজকে বলেন, অতীতে ব্যবসায়ীদের কাছে হালখাতা ছিল বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব। বৈশাখের প্রথম দিন মফস্বল বা শহরে, ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালখাতার আয়োজন করা হতো। তবে হালখাতার সেই আনন্দ-উৎসব এখন আর নেই। এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে হালখাতা।

এন কে বি নয়ন/এসআর/জিকেএস