মোশাররফ ছাড়াই আ’লীগের বর্ধিত সভা, ফরিদপুরে উৎসব আমেজ
আগামী ১২ মে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন উপলক্ষে দলটির বর্ধিত সভা হবে রোববার (১৬ এপ্রিল)। একাধিক প্রেসিডিয়াম মেম্বারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা এতে উপস্থিত থাকবেন। শহরের গোয়ালচামটে হোটেল র্যাফেলসইনে দুপুর ২টায় শুরু হবে সভার কার্যক্রম। তবে সদর আসনের এমপি ও সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ সভায় থাকছেন না।
সম্মেলনকে সামনে রেখে এ বর্ধিত সভা ঘিরে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। শহরের সড়কপথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছাড়াও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের প্রবেশমুখ শিবরামপুর সাইনবোর্ড, দক্ষিণাঞ্চলমুখে মধুখালী, বরিশাল প্রান্তে ভাঙ্গাজুড়ে প্রায় শতাধিক তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের সড়ক পথের দুই ধারে, ডিভাইডারের মাঝে শোভা পাচ্ছে ব্যানার ফেস্টুন। বিভিন্ন নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চাই সম্বলিত বিশালাকৃতির ব্যানার দৃষ্টি কেড়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ। বিশেষ অতিথি আরেক প্রেসিডিয়াম কর্নেল ফারুক খান, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর্জা আজম, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু প্রমুখ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্ধিত সভা ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে সম্মেলনের আমেজ বিরাজ করছে। সভায় সম্মেলন প্রস্তুতির বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটি গঠন করা হবে। সম্মেলনের ভেনু নির্ধারণ ও অতিথি নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি জেলার নেতারা দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য রাখবেন।
সম্মেলনের প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের এ প্রস্তুতি সভাকে ঘিরে পদ প্রত্যাশীরা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। কর্মী সমর্থক ও জেলাবাসীর নামে তাদের ব্যানার, ফেস্টুনের পাশাপাশি ঢাউস আকৃতির ডিজিটাল ব্যানার চোখে পড়ছে প্রায় সব জায়গাতেই। কেন্দ্রীয় নেতাদের ছবি দিয়ে অনেকে নিজেদের ব্যানার ও বিলবোর্ড তৈরি করে শহরের আনাচে কানাচে স্থাপন করেছেন।
দলীয় সূত্র ও একাধিক নেতাকর্মীরা জানান, ২০১৬ সালের ২২ মার্চ জেলার আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট সুবল চন্দ্র সাহা এবং সাধারণ সম্পাদক পদে বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেনের নাম ঘোষণা করেন। এরপর ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে ফরিদপুর সদর আসনে নৌকার প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য হন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এরপর তিনি জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একক কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন। নিজ দলের প্রতিপক্ষদের কোণঠাসা রেখে দীর্ঘ প্রায় ১১ বছরেরও বেশি সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি পরিচালনা করে আসছিলেন।
তবে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে ২০২২ সালের জুনে এক শুদ্ধি অভিযানে খন্দকার মোশাররফের প্রভাববলয় তছনছ হয়ে যায়। তার অনুসারীদের শীর্ষ সবাই একের পর এক মানি লন্ডারিংসহ নানা মামলায় গ্রেফতার হন। সর্বশেষ তার ব্যক্তিগত সহকারী এইচএম ফোয়াদ ও ছোট ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এদিকে জেলায় আওয়ামী রাজনীতিতে পট পরিবর্তনের পরে নতুন করে সম্মেলন আয়োজনের কানাঘুষা চলছিলো গত দুই বছর ধরেই। এজন্য তখন থেকেই পদ পেতে গ্রুপিং, লবিং ও দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয়। মোশাররফের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পতনের পর ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিভক্তি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টিতে আসতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশা করে শহরের আনাচে-কানাচে পোস্টারিং ও বিলবোর্ডের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াতেও ঝড় তুলেছেন সমর্থকেরা।
সভাপতির তালিকায় সাবেক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাবু বিপুল ঘোষ, বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট সবুল চন্দ্র সাহা, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শামীম হক, সাবেক কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য ও ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন রয়েছেন।
সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রত্যাশী রয়েছেন জেলার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেন, জেলা যুগ্ম সম্পাদক ঝর্না হাসান, জেলা মহিলা সম্পাদিকা আইভি মাসুদ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা লিয়াকত হোসেন, ফরিদপুর পৌর মেয়র অমিতাভ বোস, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ডক্টর যশোদা জীবন দেবনাথ এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রবীর শিকদার প্রমূখ।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বর্ধিত সভা অনুষ্ঠানের সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। নেতাকর্মীদের মাঝে সভাকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। আশাকরি সুন্দর ও শুশৃঙ্খলভাবে বর্ধিত সভা সম্পন্ন হবে। একটি বড় দলের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই। বর্ধিত সভায় জেলা ও উপজেলার শীর্ষ নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দলের সাংগঠনিক অবস্থা তুলে ধরতে পারবেন। এমনকি দল চালাতে যেকোনো গঠনমূলক পরামর্শ দিতে পারবেন।
এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাবু বিপুল ঘোষ জাগো নিউজকে বলেন, ২০০৫ সালের আগে ১৩ বছর আমি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। ২০০৫ সালের সম্মেলনে আমি সভাপতি প্রার্থী ছিলাম। আমাদের প্রিয় নেত্রীর কথা মতো আমি সেবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে চলে যায়। এরপর ২০১৬ সালের কমিটিতে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার হোসেনের কারণে আমাকে সভাপতি পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার এই শেষ সময়ে নেত্রীর কাছে একটি চাওয়া দল পূনর্গঠনে আমাকে দায়িত্ব দেবেন। অনেকে আমাকে অসুস্থ বলে মিথ্যা প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছে, যা একটি গুজব।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সবুল চন্দ্র সাহা জাগো নিউজকে বলেন, এই সভায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি সংযোগস্থাপন হবে। এভাবেই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। এতে দল উপকৃত হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত শক্তিশালী হবে।
এন কে বি নয়ন/এফএ/এমএস