ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা মাজহারে নাজেহাল ইছালীর ৬ গ্রাম

জেলা প্রতিনিধি | যশোর | প্রকাশিত: ০৭:১৭ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২২

বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম মাজহার ও তার লোকজনের কাছে নাজেহাল যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম। প্রায় ১০ বছর ধরে ওই এলাকায় মাজহার ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধামকিসহ নানা কায়দায় লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে গ্রামগুলো থেকে অন্তত ৩০ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাদের কাছ থেকে মাজহার ও তার লোকজন ২৫ লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজি করেছেন বলে অভিযোগ। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর মাজহারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন এলাকাবাসী।

যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মাজহারুল ইসলাম মাজহার। তিনি যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সম্প্রতি ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির অডিও ভাইরাল হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এর পর এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ২০১৪ সাল থেকে ইছালী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর, কামারগন্যা, হাশিমপুর, কুতুবপুর, জয়রামপুর ও শুড়া গ্রামে ‘রাজত্ব’ কায়েম করেন মাজহার। এলাকায় তার প্রায় ৩০/৪০ জনের একটি বাহিনী রয়েছে। হুমকি, ধামকি ছাড়াও গ্রামের যে কোনো বিবাদ মীমাংসায় যুক্ত হন মাজহার। এরপর দুপক্ষের কাছ থেকেই চাঁদা আদায় করেন। জমি, পাওনা টাকা, নারীঘটিত বিষয় কিংবা পারিবারিক বিরোধ-যাই হোক না কেন মাজহার ও তার বাহিনী সেখানে উপস্থিত হয়ে অর্থ বাণিজ্য করেন বলে অভিযোগ।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের রেজাউল ইসলাম, আবদুল গনি, তাইজেল, আশরাফ, আব্দুল মান্নান, তবিবব, আব্দুল আজিজ, ইন্তাজ আলী, সাইদুল ইসলাম, মিঠুন, নজরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ, মোছাম্মৎ চম্পা, নূর ইসলাম, আব্দুল মান্নান, আলতাফ হোসেন, নারায়ণ হালদার, লোকমান, আব্দুল মজিদ, নুরো, জগদীশ, কামারগন্যা গ্রামের মোছাম্মৎ সখিনা, হিদায়জুল মাস্টার, কাশেম মোল্যা, হাশিমপুরের সুভাস মাস্টার, কুতুবপুরের বাবর আলী, সিরাজুল ইসলাম, জয়রামপুরের শিখা মেম্বারসহ অন্তত ৩০ জনের কাছ থেকে ২৫ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করেছেন মাজহার ও তার লোকজন। এই তালিকার বাইরেও অনেকেই মাজহারের চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। তবে এখনো ভয়ে অধিকাংশ মানুষই মুখ খুলতে চান না।

মাজহারের চাঁদাবাজির শিকার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের তবিবর রহমান বলেন, আমি সেই সময় চেঙ্গুটিয়া বাজারে কাজে ছিলাম। অথচ এলাকার একটি ঘটনায় মাজহার আমাকে মামলায় জড়িয়ে দেয়। পরে সেই ঝামেলা মেটানোর নামে অর্ধলক্ষাধিক টাকা নিয়েছে। তাইজেলের ছেলের সঙ্গে বউয়ের ছাড়াছাড়ি নিয়ে সালিশ মীমাংসা করে এক লাখ টাকা নিয়েছে। এলাকায় আমরা হিসাব করে দেখেছি অন্তত ২৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেছে মাজহার ও তার লোকজন।

জানা গেছে, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের লোকমানের খালা মোছাম্মৎ চম্পা এলাকায় সুদের কারবার করতেন। চম্পা ভারতে থাকাকালে সুদে টাকা নিয়ে বিবাদ হওয়ায় মাজহার বাহিনীর রোষে পড়েন লোকমান। মাজহারের লোকজন প্রতিনিয়ত তার বাড়িতে গিয়ে হুমকি-ধামকি দিতেন। পরে টাকা দিয়ে এবং ভারত থেকে চম্পাকে বাড়িতে আনার পর মাজহারের কবল থেকে মুক্তি পান লোকমান। আর সুদের টাকা নিয়ে বিবাদ মেটাতে চম্পাকেও দিতে হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে লোকমান বলেন, আমি নিরীহ মানুষ। ভ্যান চালিয়ে খাই। আমি এই নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। শুধু লোকমান নন, তালিকায় নাম থাকা আরও অনেকেই ঘটনা স্বীকার করলেও আতংকে নাম প্রকাশ বা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

রামকৃষ্ণপুরের আব্দুল মান্নান বলেন, জমি বন্দক নিয়ে একজনকে ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। বন্দকের বৈধ কাগজপত্রও রয়েছে। এই টাকা আদায় নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে মধ্যে মাজহার ঢুকে পড়ে। পরে তার বাহিনীর লোকজনের মাধ্যমে হুমকি-ধামকি দিয়ে আমাকে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় বন্ধক ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। বাকি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মাজহার ও লোকজন নিয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম মাজহার বলেন, গোটা ইছালী ইউনিয়নে তার বিরুদ্ধে যদি কেউ অভিযোগ দেয়, তাহলে এ জীবন তিনি রাখতে চান না। তিনি মানুষের জন্য রাজনীতি করেন। করোনাকালসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি নানাভাবে গ্রামের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং এখনো দাঁড়াচ্ছেন। তার চলার পথে একটিই ভুল ইছালী স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ফোন করা। ওই ফোন রেকর্ড এডিট করে ভাইরাল করা হয়েছে। এর জন্য দল তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। মাজহার দাবি করেন, রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে তাকে এমন ঘটনার শিকার হতে হয়েছে।

ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করা নিয়ে গত ৪ এপ্রিল মাজহারুল ইসলাম মাজহার স্কুলটির প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলামকে মুঠোফোনে হুমকি দেন। এর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, যশোর সদর উপজেলার ইছালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগের কমিটির অগোচরে যুবলীগনেতা মাজহার ও তার সহযোগীরা অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মনিরুজ্জামানকে নিযুক্ত করেন। এতে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও অভিভাবকরা ওই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনাসহ একজন অভিভাবক হাইকোর্টে মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি চলমান।

এর জেরে মাজহার প্রধান শিক্ষককে ফোন করে কমিটি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে বলেন। তাকে কমিটির বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে জানালে ওই শিক্ষককে গালিগালাজসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই জিডিতে নিরাপত্তা চেয়ে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন। পরে শিক্ষককে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকির ঘটনা তদন্তের অনুমতি দেন আদালত।

আর হুমকির অডিও ভাইরাল হওয়ায় মাজহারকে যুবলীগ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল স্বাক্ষরিত অব্যাহতিপত্রে বলা হয়েছে, যুবলীগ একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন। কিন্তু যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম মাজহারের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যকলাপের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকার কারণে তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হলো।

মিলন রহমান/এমআরআর/এমএস