৭ মাস ডুবে থাকে চারদিক, নৌকা-ভেলাই ভরসা দুই গ্রামের
নৌকা বা ভেলা দিয়েই যাতায়াত করতে হয় গ্রামবাসীকে
‘চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ভালো লোক তাই এ রাস্তার কোনো উন্নয়ন হয় না। ভোট এলে আমাদের কদর বাড়ে, কিন্তু ভোট শেষে কেউ আমাদের খবর নেয় না। জাতীয় সংসদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আমরা গত ৫০ বছর ধরে ভোট দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু নাগরিক সুবিধা বলতে যা বুঝায় তা আমাদের ভাগ্যে জোটে না।’
আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বৈণ্যাতলী ও গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দারা।
ভৌগলিকভাবে নিচু এলাকা হওয়ায় বাংলা বছরের জ্যৈষ্ঠ থেকে অগ্রাহায়ন পর্যন্ত দুই গ্রামের চারদিক পানির নিচে থাকে। এতে যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা না থাকায় নৌকা আর কলার ভেলাই একমাত্র ভরসা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যায় শিশুরা।

গ্রাম দুটির উত্তরে বাসাইল উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের মটেশ্বর ও সখিপুর উপজেলার হাতিবান্দা এবং পূর্ব পাশে মির্জাপুর উপজেলার তরফপুর গ্রাম। গত ৫০ বছর ধরে ভোট দিয়ে এলেও ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত দুই গ্রামের বাসিন্দারা।
দুই গ্রামের কাছে নেই কোনো বিদ্যালয়। তাই দুই কিলোমিটার দূরে বংশাই নদী পার হয়ে তরফপুর ইউনিয়নের তরফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয় এখানকার শিশুদের। যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেন বলে জানান গ্রামবাসী।
এদিকে, হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম দুটিতে কেউ মারা গেলে বর্ষায় তাদের সৎকার করতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ বর্ষার সময় রাস্তা ও নিচু শ্মশান ঘাটটি পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া রাস্তা না থাকায় ওই এলাকার কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্যও পান না।

গোবিন্দপুর গ্রামের খুঁশিমোহন সরকার, মদন মন্ডল, নিরু মন্ডল, লালচান সরকার, তাপস সরকার, বৈণ্যাতলী গ্রামের হরিনাথ মন্ডল, সুবল মন্ডল, মহাদেব মন্ডল, যতিশ মন্ডল বলেন, আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি নির্বাচনে আমরা প্রার্থী দেখে নয়, নৌকা মার্কায় ভোট দেই। প্রতি নির্বাচনের আগে সবাই আসেন এবং নানা প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোট গেলে আর কারও দেখা মেলে না।
গোবিন্দপুর গ্রামের উষা রানী মন্ডল, উজ্জল রানী মন্ডল, বৈণ্যাতলী গ্রামের অর্চণা মন্ডল বলেন, নৌকাযোগে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। এ কারণে অনেক অভিভাবক তাদের ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন।
চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুস্মিতা সরকার জানায়, নৌকায় পার হতে ভয় লাগে। এরপরও যেতে হয়।

গোবিন্দপুর গ্রামের শুকলাল সরকার, স্বপ্না সরকার বৈণ্যাতলী গ্রামের রবিন্দ্র মন্ডল, কৃষ্ণ মন্ডল ও পুষ্প মন্ডল বলেন, ফতেপুর ইউনিয়নের শুতানরি গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। এছাড়া রামপুর খেয়াঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার। গ্রামবাসীর যাতায়াতের জন্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মৃত হাসমত আলী রাস্তা নির্মাণ করে দেন। কিন্তু নিচু এলাকা হওয়ায় বছরের প্রায় সাত মাস পানির নিচে।
তারা আরও জানান, গ্রামের কয়েকজন বিধবা ও বয়স্ক ভাতা পান। এছাড়া মাতৃকালীন ভাতাসহ সরকারের অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা মিলছে না।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন তালুকদার বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের দাদারা আমাকে কৃষ্ণ বলে ডাকেন।’

গোবিন্দপুর ও বৈণ্যাতলী গ্রামের রাস্তার উন্নয়ন বা সংস্কার কাজ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৫ জুন পুনরায় জয়ী হতে পারলে ওই রাস্তাটি পাকা করে দিবো।’
ফতেপুর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম সিকদার বলেন, ‘আমাদের জন্য এটা লজ্জাকর ঘটনা। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও গ্রাম দুটিতে যাতায়াতের এ দুরবস্থা পীড়াদায়ক।
বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ বলেন, ‘কোদাল এবং টুপড়ি দিয়ে মাটি ফেলে রাস্তা করা সম্ভব নয়। প্রকল্পের মাধ্যমে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই রাস্তা করা সম্ভব হবে। সামনের ইউপি নির্বাচনের পর রাস্তাটির স্থায়ী কাজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’
এস এম এরশাদ/এসজে/এমএস