মৌসুম শেষেও পেঁয়াজের দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা
সর্ববৃহৎ পেঁয়াজের হাট বনগ্রামে বিক্রেতাদের ভিড়
শুরু থেকে পেঁয়াজের দাম কম ছিল। দাম বাড়ার আশায় অনেকে পেঁয়াজ মজুত রেখেছিলেন। তবে মৌসুমের শেষেও পেঁয়াজের ন্যায্য দাম না পেয়ে হতাশ কৃষকরা। ফলে উৎপাদন খরচও উঠছে না অনেকের।
শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দেশের সর্ববৃহৎ পেঁয়াজের হাট বনগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, হাটভর্তি পেঁয়াজ। হাটে জায়গা না পেয়ে অনেকে রাস্তার ওপর ভ্যানে পেঁয়াজের বস্তা রেখেছেন। উৎপাদনের অনুপাতে বাজারে চাহিদা নেই। ব্যাপারীরা বেশি পেঁয়াজ কিনতে উৎসাহী নন। ফলে ব্যাপারীদের ডেকে ডেকে এনে চাষিরা পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। সবচেয়ে ভালো মানের পেঁয়াজ ১২০০-১৪০০ টাকা মণ বিক্রি হয়। আর ফেটে যাওয়া পেঁয়াজ ১০০০-১২০০ টাকা মণ।
হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা চাষিরা জানানা, এক লিটার সয়াবিন বা সরিষা তেল কিনতে হচ্ছে ২০০-২৫০ টাকায়। সেখানে চার-পাঁচ লিটার তেল কিনতেই এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি টাকা শেষ। লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচও উঠছে না।

ভদ্রকোলা গ্রামের চাষি ফজলুল হক বলেন, ‘১২০০ টাকা মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। আশা ছিল মৌসুমের শেষে ভালো দাম পাবো। কিন্তু হাটে এসে দেখি পেঁয়াজ কেনার ব্যাপারী কম। ন্যায্য দাম না পেয়ে আমি হতাশ।’
সুজানগরের চাষি মো. বাচ্চু বলে, ‘এক লিটার তেল কিনি ২০০ টাকায়। আর পেঁয়াজের দাম একটু বাড়লেই বলা হয় ‘পেঁয়াজ কি আপেল কমলা’। এখন তো দাম কম কিন্তু নেই। সরকার এখন আমাদের পেঁয়াজ কিনুক।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকার বাইরে থেকে আরও বেশি পেঁয়াজ আনুক। এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ হয় ৪০ মণ। তাহলে এক বিঘা থেকে কত টাকা পাওয়া যায় আর কত টাকা খরচ হয় তার হিসাব করা দরকার।’
সাঁথিয়া উপজেলার বামনডাঙ্গা গ্রামের চাষি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে হলে শুরুতেই বীজ কেনা ও চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা ভাড়া করতে হয়। জমি চাষ, সেচ, সার, গোবর, নিড়ানি, শ্রমিক ও উত্তোলন খরচ মিলিয়ে বিঘা প্রতি প্রায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। যারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে আবাদ করেন তাদের বিঘা প্রতি আরও টাকা গুনতে হয়। এছাড়া অনেক ছোট বড় চাষি চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার প্রতি বিঘা পেঁয়াজের জমি বার্ষিক লিজ নিতে হয়েছে ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে। এতে পেঁয়াজ চাষিদের বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে ৪০-৪৫ হাজার টাকা। এক বিঘায় পেঁয়াজের গড় ফলন হয় ৪০-৫০ মণ। সে হিসেবে প্রতি মণ ১২০০-১৪০০ টাকা বিক্রি করলে উৎপাদন খরচ উঠছে না। এছাড়া নিম্নমানের পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে আরও কম দামে।’

পেঁয়াজের ব্যাপারী আ. রশিদ বলে, ‘বনগ্রাম, আতাইকুলা, কাশীনাথপুর, চিনাখড়া প্রভৃতি হাট থেকে পেঁয়াজ কিনে কারওয়ান বাজার, নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করি। আড়তে দাম কম। তাই বেশি দামে পেঁয়াজ কেনা সম্ভব হচ্ছে না।’
বাংলাদেশ ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি ও পাবনা জেলার বিশিষ্ট চাষি শাহজাহান আলী বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজার সবচেয়ে অস্থিতিশীল। কখন হঠাৎ দাম বেড়ে যায় আবার একবারে কমে যায় তা বলা মুশকিল। এতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। যদি লাভ না হয় তাহলে চাষিরা আজীবন ঋণে আবদ্ধ থাকবেন। সব কৃষি পণ্যের সঙ্গে পেঁয়াজ চাষিরাও যেন লাভবান হন তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের নীতি নির্ধারকদের সে ব্যাপারটি লক্ষ্য রাখতে হবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনা উপ-পরিচালক ড. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, পাবনা জেলার সাঁথিয়া ও সুজানগর পেঁয়াজের রাজধানী। দেশের এক চতুর্থাংশের বেশি পেঁয়াজ পাবনা জেলা থেকে উৎপাদন হয়।
তিনি আরও বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে চাষিরা সাধারণত ভালো দাম পেয়ে থাকেন। এবার বাজারে যোগান বেশি থাকায় দাম কিছুটা কম হয়েছে।
আমিন ইসলাম জুয়েল/এসজে/এমএস