‘আলোকিত দুবলিয়া’র রূপকার অধ্যক্ষ মাহাতাব
পাবনা জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জনপদে গড়ে তুলেছেন শতাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা। এখন স্বপ্ন দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। এরই মধ্যে জমি প্রদান ও ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
‘আলোকিত দুবলিয়া’র রূপকার বলে পরিচিত শিক্ষানুরাগী এ ব্যক্তি হলেন পাবনা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলহাজ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস। তিনি পাবনা কলেজ, দুবলিয়ায় হাজী জসীম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ, পদ্মা কলেজ, ফজিলাতুন্নেছা গার্লস হাইস্কুলসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা
মাহাতাব উদ্দিনের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা মরহুম হাজি জসীম উদ্দিন বিশ্বাস। মা ফজিলাতুন্নেছা ছিলেন একজন মহীয়সী রমণী।

পাবনা শহর থেকে ১৫-১৬ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত দুবলিয়া গ্রাম। কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও শিক্ষায় এক সময়ের পশ্চাদপদ এ এলাকায় হাইস্কুল, নারী শিক্ষার প্রসারে গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিয়েছে ডিগ্রি (অনার্স) কলেজ। গড়ে উঠেছে বিশাল পাঠাগার। শিক্ষার ছোঁয়া লেগেছে এখানকার কৃষি ব্যবস্থাতেও।
দুবলিয়া ফজিলাতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল খালেক খাঁন জানান, দুবলিয়া এলাকার এগিয়ে যাওয়ার পালে হাওয়া লাগিয়েছেন অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস। তার সাধ ছিল এলাকার মানুষের জন্য কিছু করা। এলাকার সাধারণ মানুষকে উঠিয়ে আনতে সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন তিনি।
পাবনা-সুজানগর সড়কের পাশে প্রায় দুই একর জায়গার ওপর অবস্থিত ফজিলাতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এটি তার মায়ের নামে (ফজিলাতুন্নেছা) প্রতিষ্ঠা করেন অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন। নারী শিক্ষার উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।
১৯৫৭ সালে দুবলিয়া হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি জুনিয়র হাইস্কুল ছিল। ফলে অনেকের পক্ষেই এসএসসি পাস করা হয়ে উঠতো না। অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস এটিকে পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল করার ব্যবস্থা করেন।

উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিয়েছে হাজী জসীম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ। ১৯৮৪ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দুবলিয়ায় তার বাবার নামে এ কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন মাহাতাব উদ্দিন।
তিনি ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সহযোগীদের নিয়ে পাবনা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথম দিকে এটি ‘নৈশ কলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরে অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিনের চেষ্টায় কলেজটি দিবা ও নৈশ কলেজে রূপান্তরিত হয়। রাজনীতিমুক্ত কলেজটি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে দুবার পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে মনোনীত হয়। এছাড়া অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস ১৯৯৭ সালে পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষকের পুরস্কার পান। এখন জেলার অন্যতম সেরা কলেজ এটি। তিনি এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নেন।
পাবনা কলেজ ছাড়াও সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ ও পাবনা মহিলা কলেজ সরকারিকরণে অবদান রয়েছে অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিনের। শুধু তাই নয়, পাবনা আবাসিক কোরানীয়া মাদরাসাসহ অনেকগুলো মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। শুধু পৈত্রিক এলাকায় বা শহরে স্কুল-কলেজ গড়ে তোলেননি মাহাতাব উদ্দিন। তিনি প্রত্যন্ত চরের মানুষের বন্ধুজন হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন।

আঞ্জুমান-ই মফিদুল ইসলামের পাবনার সভাপতি মোশারফ হোসেন জানান, উচ্চশিক্ষা এমনকী প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল পাবনা সদরের ভাড়ারাসহ কয়েকটি চরের জনসাধারণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব ও অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে পিছিয়ে পড়েছিলেন তারা। পিছিয়ে ছিল পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা, চরকোমরপুর, চর আশুতোষপুরের শিক্ষার্থীরা। এ কারণে চরের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও মানসিকতার বিকাশ ঘটছিল না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, চাকরি, উন্নয়ন, কৃষি সবদিকে পিছিয়ে ছিলেন তারা। দূরদর্শী মাহাতাব বিশ্বাস চরে ভাড়ারা রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয়, পদ্মা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে দৃশ্যপট পাল্টে দেন।
দুবলিয়া ফজিলাতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানাউল্লাহ খাঁন রাজু বলেন, মাহাতাব বিশ্বাসের অসামান্য অবদানের কথা দুবলিয়াবাসী ভোলেননি। তিনি নিজে অধ্যক্ষ বিশ্বাসের অনেক উন্নয়ন কাজের প্রত্যক্ষদর্শী।
চরতারাপুর ইউনিয়নের চেয়াম্যান ও দুবলিয়া ফজিলাতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দুবলিয়া-চরতারাপুর এলাকা একসময় অনুন্নত ছিল। শিক্ষায়ও পিছিয়ে ছিল। সেই পশ্চাদপদ এলাকার উন্নয়নে অগ্রনায়ক অধ্যক্ষ মাহাতাব বিশ্বাস।

দুবলিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, এ হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে অধ্যক্ষ মাহাতাব বিশ্বাস এবং তাদের পরিবারের বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি প্রায় দুই যুগ এ প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন।
দুবলিয়া হাজী জসীম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের বর্তমান গভর্নিং বডির সভাপতি ফুরকান রেজা বাদশা বিশ্বাস বলেন, অধ্যক্ষ মাহাতাব বিশ্বাসের মতা ক্ষণজন্মা মানুষ প্রতিবছর জন্ম নেয় না। শতাব্দীতে জন্ম নেয়।
পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স জাগো নিউজকে বলেন, অধ্যক্ষ মাহাতাব বিশ্বাস একদিন থাকবেন না কিন্তু তার গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো হাজার বছর ধরে টিকে থাকবে। এর মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ মাহাতাব বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়া তার শেষ জীবনের একটি স্বপ্ন। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নিজ জায়গার ওপর ১০ তলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করেছেন। শহরের অদূরে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার ১০০ বিঘা আয়তনের খামারের অন্তত ২০ কোটি টাকা দামের ১০ বিঘা জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দিয়েছেন। তার প্রস্তাবিত মাস্ট ইউনিভার্সিটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এসআর/জিকেএস