ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

রংতুলির আঁচড়ে বদলে যাচ্ছে সাঁথিয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়

আমিন ইসলাম জুয়েল | প্রকাশিত: ০৬:৪৪ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২২

শিশু শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে সরকারিভাবে বরাদ্দ টাকায় রঙিন করে তোলা হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার ছোঁয়া লেগেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার স্কুলে-স্কুলে। বিদ্যালয়ের প্রবেশ মুখ ও দেওয়ালে দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে বাংলা-ইংরেজি বর্ণ। শ্রেণিকক্ষ ও ভবনের চারপাশে ফলমূল, দেশ-প্রকৃতি, কার্টুনসহ নানা মনীষীর ছবি ও বাণী।

এভাবেই রংতুলির আঁচড়ে সাজিয়ে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে স্কুলগুলোকে শিশুবান্ধব করার সব রকম চেষ্টা চলছে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন ছোটবেলা থেকেই শিল্পমনা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, জানছে দেশ-প্রকৃতি সম্পর্কে, তেমনি শিশু মনে শ্রেণিপাঠ সহজবোধ্য হচ্ছে। এতে বেশি করে স্কুলগামী হচ্ছে শিশুরা। ঝড়ে পড়া কমছে, বনেদী ঘরের শিশুদেরও এখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করছেন অভিভাবকরা।

সাঁথিয়া উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সরকারি অর্থায়নে স্কুল সুসজ্জিত করা ও শিশুবান্ধব শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে ১৭৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক- প্রাথমিক শ্রেণির সব কক্ষ সুসজ্জিত করা হয়েছে। আর ২৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের ভবন ও সব শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সাঁথিয়া উপজেলার সব বিদ্যালয় ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সুসজ্জিত করা হবে বলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন।

সরেজমিন কয়েকটি স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়গুলোকে রঙিন করে সাজানো হয়েছে। রংতুলির ছোঁয়ায় বিদ্যালয়গুলো এখন যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। সব স্কুলের আঙিনায় স্থাপন করা হয়েছে শহীদ মিনার। অনেক বিদ্যালয়ের দেওয়াল যেন রংধনুর সাতরঙে রাঙানো। মাঝে মাঝে বিভিন্ন মনীষীর ছবি ও বাণী। শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রবেশের আগে এসব ছবির মনীষীদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

রঙিন সাজে সজ্জিত সাঁথিয়া উপজেলার কাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বামনডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমাইকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চারুশিল্পীরা দেওয়ালে-দেওয়ালে এঁকেছেন ছোটদের মিনা কার্টুন, ফুল-ফল ও পশু-পাখির ছবি। এছাড়া প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে আঁকা হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র ও গুণীজনের প্রতিকৃতি। লেখা আছে শিক্ষামূলক নানা নীতিবাক্য। প্রতিটি বিদ্যালয়ে রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে জানার জন্য বঙ্গবন্ধু কর্নার, বই পড়ার অভ্যাস গড়তে শেখ রাসেল বুক কর্নার। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের বীর সেনানীদের ছবি ও ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে রঙিন চিত্রে। বিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে শিশুদের ওজন ও উচ্চতা মাপার যন্ত্র। বয়সের সঙ্গে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও ওজন ঠিক আছে কী না তা পরীক্ষা করে দেখেন শিক্ষকরা। কোনো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া হয়।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, শিশুদের শৈশবকে আক্ষরিক অর্থেই সাতরঙা করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মানসম্মত ও দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিদ্যালয়কে ঢেলে সাজানো হবে। সেই ধারাবাহিকতায় সাঁথিয়া উপজেলায় বিদ্যালয় সজ্জিতকরণের কাজ করা হয়েছে। সরকারি স্লিপ ফান্ডের টাকা ব্যয়ে পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব স্কুলে এমন কাজ করা হবে।

পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি প্রাইমারি স্কুল পিইডিপি-৪ এর আওতায় স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (স্লিপ) অংশ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছে। তাছাড়া ছোটখাটো মেরামতের জন্য অনেক বিদ্যালয় বরাদ্দ পেয়েছে। এ টাকায় বিদ্যালয় শিশুবান্ধব করার কাজ চলছে।

সাঁথিয়া উপজেলার দুটি রঙিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানালেন, অনেক চিকিৎসক, অধ্যাপকরা তাদের সন্তানদের কিন্ডার গার্টেনে না দিয়ে এখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করছেন। এসব শিশুদের তারা আগে পেতেন না। এতে অন্য অভিভাবকরাও এখন প্রাইমারি স্কুলের প্রতি উৎসাহী হচ্ছেন।

কাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাইমা খাতুনসহ কয়েক শিক্ষার্থী জানায়, এখন স্কুলে এসে আর বিরক্ত লাগে না। সাজানো গোছানো বিদ্যালয়, এটা তাদের জন্য খুব আনন্দের। এখন শিক্ষকরা যতক্ষণ ছুটি না দেন ততক্ষণ তারা স্কুলে থাকে।

আমাইকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তোয়া মণি জানায়, সকালে স্কুলে এসেই তাদের আনন্দ লাগে। তারা ছবি দেখে অনেক কিছু শিখতে পারছে। এখন শিক্ষকরা অনেক উপকরণসহ পাঠ দেন। এতে তাদের ভালো লাগে। স্কুলটি এখন তাদের কাছে আনন্দের।

নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কাজী ফাইরুজ নাওয়ার সুপ্তি জানায়, তাদের স্কুলটি সাজানো গোছানো। পাঠের অনেক কিছু দেওয়ালে আঁকানো। এটি তাদের পাঠ বুঝতে খুব সাহায্য করে।

আমাইকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহবুবুল আলম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়টি সুসজ্জিত করার পর লক্ষ্য করছি শিশুরা এখন বেশ আগে স্কুলে আসে। তারা নিজেরাও ছবি দেখে ছবি আঁকে। অনেক শিশু আমাকে প্রশ্ন করে এ ছবি কিসের?

তিনি আরও বলেন, এ থেকে বুঝতে পারছি একটা সুন্দর ফলাফল আসা শুর হয়েছে। কারণ এরই মধ্যে কিন্ডার গার্টেন, ব্র্যাক স্কুল থেকে শিশুরা এখন প্রাইমারিতে আসছে।

বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অভিভাবক এবং এসএমসি কমিটির সভাপতিরাও সুসজ্জিত বিদ্যালয়ের ইতিবাচক দিক সমন্ধে জানান। কাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক আলতাব হোসেন জানান, আগে স্কুলটি জরাজীর্ণ ছিল। এখন তিনতলা সুসজ্জিত বিদ্যালয় ভবন পেয়ে শিশুরা খুশি, তারাও খুশি। স্কুলকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলায় স্কুলের প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি শিশুদের আগ্রহ বাড়ছে বলেও তিনি জানান।

মাধপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি প্রভাষক সালাউদ্দিন আহমেদ জানান, স্কুলটি সুসজ্জিত করায় বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিশুবান্ধব হয়েছে। রঙিন ছবি, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপন করায় শিশুদের জানার পরিধি বাছে। এছাড়া নানা রকম উপকরণ ব্যবহার করায় শিক্ষার মানোন্নয়ন হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিশুদের মনোবিকাশে কাজ করছে।

সাঁথিয়ার নন্দনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান জানান, সুন্দর মন, সুস্থ পরিবেশ খুব বেশি প্রয়োজন। স্কুলের পরিবেশ সুন্দর হওয়ায় পড়াশোনায় মনযোগী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এতে শিশুরা বেশি করে স্কুলমুখী হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করছে তারা। এমন উদ্যোগে তিনিসহ তার সহকর্মী শিক্ষকরাও উদ্দীপ্ত।

কাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, স্কুলের দেওয়ালে যেসব ছবি আঁকা হয়েছে তা সবই পাঠ্যবই সংশ্লিষ্ট। এতে করে ছবি দেখেই শিশুরা পাঠ সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করছে। এতে তাদের অনুধাবন ক্ষমতা, সৃজনশীলতা বাড়ছে। পাঠ আনন্দদায়ক হয়ে উঠছে।

আমাইকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মনজুরা পারভীন বলেন, বিদ্যালয়টি বদলে গেছে। এখন শিশুরা আর আমাদের বিদ্যালয় ছেড়ে কিন্ডার গার্টেন বা অন্য স্কুলে যাচ্ছে না। উপস্থিতি শতভাগ হয়েছে। এখানে অনেক শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা তাদের সন্তানদের প্রাইমারি স্কুলে পাঠাচ্ছেন। শিশুরা আনন্দের সঙ্গে স্কুলে আসে। তারা বিদ্যালয়ে এসে আনন্দের সঙ্গে পাঠ নিতে পারছে।

সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার বলেন, বিদ্যালয়কে রঙিন করলে একদিক থেকে যেমন বিদ্যালয়টি দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে তেমনি শিশুদেরকেও আকর্ষণ করছে। বিদ্যালয়ে এখন শিশুরা আসে আনন্দ চিত্তে।

তিনি আরও, স্বপ্নের কোনো শেষ নেই। স্বপ্নের মতো করে রঙিন সাজে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সাজানো হচ্ছে। বর্তমান সরকারের এমন উদ্যোগে ব্যাপকভাবে সাড়া দিচ্ছে শিশুরা। অল্পদিনের মধ্যেই পুরো উপজেলার স্কুলগুলো এভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

সাঁথিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হেলাল উদ্দিন বলেন, সাঁথিয়ায় সরকারি অর্থায়নে স্কুলগুলোকে স্মার্ট স্কুলে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। স্কুলগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করতে দেওয়ালে নানা রঙের ছবি ও কার্টুন আঁকা হয়েছে। যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী হয়। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান করানো হচ্ছে। স্কুলের দেওয়ালে নানা ছবি, বর্ণনায় তাদের জ্ঞানের দুয়ার সহজেই খুলে যাচ্ছে। পাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা উপকরণ ব্যবহারে শিশুদের একঘেয়েমি বা বন্দিদশা থাকছে না। স্কুলগুলো হয়ে উঠেছে শিশুদের জন্য আনন্দমুখর।

এমআরআর/এএসএম