বখাটের অ্যাসিডে দু’চোখ হারিয়েও সফল মনি
বখাটের ছোঁড়া অ্যাসিডে দু’চোখ পুড়ে অন্ধ হলেও দমাতে পারেনি তাকে। প্রায় চার বছর আগে দু’চোখ হারিয়েও পড়ালেখা চালিয়েছে অনায়াশে। চলতি বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় সমাজ কল্যাণ বিদ্যাবিথী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ ৩.৬৯ পেয়েছে সে।
অন্ধত্বকে হার মানিয়ে সাফল্যের আরো একধাপ এগিয়ে চলা এই অদম্য শিক্ষার্থী রংপুরের দক্ষিণ বাবখাঁ গ্রামের মাসুদা আক্তার মনি।
সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও একমাত্র মেয়েকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে মা সুলেকা পারভীনের ইচ্ছের কোনো কমতি ছিল না। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় একই এলাকার বখাটেরা ২০১২ সালের ১৩ আগস্ট অ্যাসিড ছুড়ে সমস্ত মুখ ঝলসে দেয় মনির। এরপর রংপুর ও ঢাকায় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে উঠলেও দু’চোখ অন্ধ হয়ে যায় তার। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও পড়াশোনা শুরু করে অদম্য মেধাবী মনি। মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সাফল্য অজর্নকারী মনি আরো এগিয়ে যেতে চায়।
ফলাফল ঘোষণার পর মনি জানায়, ঢাকায় ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হতে চায় সে। ইতোমধ্যে ঢাকাতেই অবস্থান করে সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে মনি। চোখের অপারেশনসহ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে যে আর্থিক সহায়তা দরকার তা কতটুকুই বা দিতে পারবেন বিধবা মা সুলেকা পারভীন, সে ভাবনাও যেন কম না। আর্থিক অস্বচ্ছলতায় যেন থমকে না দাঁড়ায় এজন্য সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছে সে।
মনির মা সুলেকা পারভীন জানান, অনেক আগেই স্বামী মাহবুবুল মারা যান। নিজেও পড়ালেখা শেখেননি আর দুই ছেলেকেও পড়ালেখা শেখাতে পারেননি। ভীষণ ইচ্ছে ছিল একমাত্র মেয়েকে সব দিক থেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার। তাই পড়ালেখার পাশাপাশি মেয়েকে ভর্তি করান নাচ ও আর্টের স্কুলে। খেলাধুলাতেও বেশ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিল মনি। সবকিছুই যখন ঠিকঠাক চলছিল আর তখনি বখাটের ছোড়া অ্যাসিডে দু’চোখ অন্ধ হয়ে যায় একমাত্র মেয়ে মনির।
প্রসঙ্গত, ঘটনার দিন ২০১২ সালের ১৩ আগস্ট মনি ও তার মা রাতের খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ১১টার দিকে আগে থেকে সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিবেশি আরিফুল, আলাল ও দুলাল ঘরের জানালা দিয়ে ঘুমন্ত মনির মুখের ওপর অ্যাসিড ছুড়ে মারে। এতে মনির মুখ, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। এসময় মেয়ের চিৎকারে মা সুলেকা পারভিন ঘর থেকে বেরিয়ে তাদেরকে ধাওয়া করলে গেলে তাকেও বখাটেরা অ্যাসিড নিক্ষেপ করে। এতে সুলেকার ডান বুকের ওপর অংশসহ পড়নের কাপড় পুড়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় মনিকে উদ্ধার করে ওই রাতেই প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
ঘটনার পরদিন ১৪ আগস্ট মনির বড় ভাই মাজেদুর রহমান সোহেল বাদী হয়ে আরিফুল, আলাল, দুলাল ও আরিফিনকে (২৬) আসামি করে কোতয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর অ্যাসিড সরবরাহের অভিযোগে রাসেল ওরফে সাদ্দামকে (২২) অভিযুক্ত করে ৫ জনের নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। প্রায় আড়াই বছর মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকার পর ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল ঘটনার মূলহোতা আরিফুল ইসলামের ফাঁসি ও তার সহযোগি আলাল এবং দুলালের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন বিচারক।
এ ঘটনায় খালাস পান মামলার অপর দুই আসামি আরিফিন ও সাদ্দাম। অভিযুক্তরা জেল হাজতে থাকলেও তাদের পক্ষে উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে।
এমএএস/এবিএস