শীতে ক্ষতিগ্রস্ত বোরো-আলু-সরিষা চাষিরা
বদলগাছীর ভাণ্ডারপুর গ্রামের কৃষক বুলু মিয়া, ইরি-বোরো মৌসুমের বীজতলা তৈরি করছেন। এরইমধ্যে তিন বিঘা জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন তিনি। কিন্তু সেই বীজতলার প্রায় পুরোটুকু লালবর্ণ হয়ে গেছে। নওগাঁর এই কৃষক বলছিলেন, ঘন কুয়াশা আরও বাড়লে বীজতলা রক্ষার উপায় নেই।
ইরি, বোরো, সরিষা, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন এ ধরনের প্রায় সব ফসলই অতিরিক্ত শীতের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন।
গেলো সপ্তাহজুড়ে নওগাঁর তাপমাত্রা ছিল ৬ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। ৭ জানুয়ারি শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় নওগাঁর বদলগাছীতে।
গত ১ জানুয়ারি আবহাওয়া অফিসের মাসব্যাপী পূর্বাভাসে বলা হয়, চলতি জানুয়ারি মাসে দেশে একাধিক শৈত্য প্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে তাপমাত্রা নামতে পারে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

শুধু বোরো নয়, কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় কম তাপমাত্রা ও কুয়াশা জমে থাকলে প্রায় সব রবি শস্যে রোগবালাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে ফলন যেমন কমে, তেমনি গুণগত মানও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আরও পড়ুন:
নওগাঁয় ৬ ডিগ্রিতে নামলো তাপমাত্রা
শীতে কাঁপছে গোটা দেশ
তাপমাত্রা নামতে পারে ৪ ডিগ্রিতে
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, ঘন কুয়াশা এবং শৈত্য প্রবাহ থেকে বীজতলা বাঁচাতে সবখানে পলিথিনে মুড়িয়ে এবং রাতে পানিতে ডুবিয়ে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা। একই সঙ্গে এই তীব্র শীতের মাঝে ইরি-বোরো রোপন না করারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে চাষিদের। তবে এ শীত দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতি বাড়বে। বোরো চাষাবাদ কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।
নওগাঁ জেলায় এ বছর ১ লাখ ৯২ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ জন্য বীজতলা তৈরি করা হয়েছে ৮ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এগ্রোমেট ল্যাব সতর্কতা জারি করে বলছে, অতিরিক্ত ঠান্ডায় বীজতলায় চারা পোড়া রোগ ও থ্রিপস পোকার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান বলেন, বীজতলায় ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখা জরুরি। এতে মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি সুষম সার ব্যবস্থাপনায় চারার স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব।
দেশের এক জেলায় নয়, উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে ঘন কুয়াশা আর টানা শীতে কৃষিতে অস্বস্তি বাড়ছে। সারা দেশেই এবার শীতের তীব্রতা অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি। যে কারণে ফসলের ঝুঁকি বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই মৌসুমে ২ দশমিক ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর বীজতলা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতে বীজতলা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি ৪ দশমিক ৬৭ লাখ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ৮৭ শতাংশ জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। কিন্তু চলমান আবহাওয়ায় আলুর লেট ব্লাইট রোগের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এ রোগের প্রকোপ কমাতে সতর্কতা পরামর্শ জারি করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এ অবস্থায় দেশে অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলা বগুড়ার কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা করছেন। এই জেলার শেরপুর উপজেলার কৃষক এনামূল হক বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। কয়েক সপ্তাহ ধরে ঠিকমতো সূর্যের দেখা নেই। এর প্রভাবে আলুর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রোগবালাইয়ের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। নিয়মিত স্প্রে করছি। খরচ বাড়ছে। এখন এ অবস্থা চলতে থাকলে কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা তিন দিন সূর্যের দেখা না পেলে আলুতে লেট ব্লাইট রোগ দেখা দেয়। এ রোগে আলুগাছ দ্রুত মরে যেতে পারে।
দেশে অনেক এলাকায় আলু ক্ষেতে কোল্ড ইনজুরির লক্ষণ দেখা দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
শীতকালীন সবজি ও সরিষাতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। মহিউদ্দিন নামের জয়পুরহাট আক্কেলপুরের কৃষক জানান, শিম গাছে ছড়া ধরে থাকছে না। প্রতি ছড়ায় শিম হয়েছে ৪-৫টি, যা অন্যান্য বছর ১৫-২০টি হতো।
অন্যদিকে, সরিষার ক্ষেতেও এবার উৎপাদন কমার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া এলাকায় বিভিন্ন ক্ষেতে সরিষার চেয়ে আগাছার পরিমাণ বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি ওই এলাকায় তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় মৌমাছি বের হতে না পারায় মধু উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, এ ধরনের বেশিরভাগ আবহাওয়া ফসলের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। সূর্যের আলো না পেলে ফসল সহজেই রোগাক্রান্ত হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ রবি শস্যের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ (ফরমেশন) চলছে। এ সময়ে আক্রমণ হলে ফলন ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, আবহাওয়ার কারণে ফসলের বেশি ক্ষতি হলে সেটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সার্বিক ব্যবস্থার চিন্তা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সব সময়ই প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকে।
এনএইচ/এসএনআর/জেআইএম