৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ে সভা
নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ
১৩ ও ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত হয়, ছবি: সংগৃহীত
পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় নেপালের সঙ্গে এবার বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের দুয়ার খুলছে। দেশটির সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) চূড়ান্ত করার পথে এগোচ্ছে ঢাকা।
সীমান্ত, পরিবহন, শুল্ক , বাজার প্রবেশাধিকারের নানা সমীকরণে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছিল না দীর্ঘদিন ধরে। এবার প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টকে (পিটিএ) একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে যার মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা, সহজ বাণিজ্য প্রক্রিয়া এবং নির্ভরযোগ্য লেনদেন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
এজন্য আগামী তিন মাসের মধ্যে ট্রেড নেগোসিয়েটিং কমিটির (টিএনসি) সভার মাধ্যমে পিটিএ এর ড্রাফট টেক্সট, রুলস অব অরিজিন টেক্সট এবং পণ্যের তালিকা চূড়ান্তকরণের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভায় এ সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত ১৩-১৪ জানুয়ারি ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত হয় বৈঠক। এতে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এবং নেপালের বাণিজ্য সচিব ড. রাম প্রসাদ ঘিমির নেতৃত্বে নেপালের প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বরছে, নেপালে এখন বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়েছে দেশটিতে। বিপরীতে দেশটি থেকে ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য আমদানি হয়েছে। সব মিলিয়ে দু-দেশের আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে মোট ব্যবসা হয়েছে মাত্র ৪০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। যদিও ১৫ বছর আগে (২০১০-১১ অর্থবছরে) এটা ছিল ৭শ কোটি টাকার কিছু বেশি। তখন অবশ্য নেপাল থেকে বাংলাদেশ বেশি আমদানি করতো এবং রপ্তানি করতো কম। সে সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১০ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৪৯ মিলিয়ন ডলার।
যদিও এরপরের ৫ বছরে কখনো বাংলাদেশ বেশি রপ্তানি করেছে, কখনো আবার নেপাল রপ্তানি করেছে। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবেই বাংলাদেশ রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে ২০২১-২২ সালে ১০৫ মিলিয়ন ডলারের সর্বোচ্চ রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
দুদেশের মধ্যকার সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের উন্নতি চায় দুদেশ। অবশ্য এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্য নেপালে রপ্তানির সুযোগ বেশি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচিব পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবার।
জানা গেছে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এই সভায়। বিশেষ করে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধা হ্রাস, পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার সহজীকরণের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় উঠে এসেছে। এছাড়া উভয় দেশের পণ্যের পারস্পরিক বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় পর্যটন উন্নয়ন ও বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বাংলাদেশ-নেপাল-ভারত ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
সভায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তকরণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ পিটিএ এর ড্রাফট টেক্সট, রুলস অব অরিজিন টেক্সট এবং পণ্যের তালিকা দ্রুত চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পণ্যের আওতায় পিটিএ বাস্তবায়ন করে পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে সম্প্রসারণের বিষয়ে বাংলাদেশ পক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরে। এজন্য আগামী তিন মাসের মধ্যে ট্রেড নেগোসিয়েটিং কমিটির সভার মাধ্যমে পিটিএ এর ড্রাফট টেক্সট, রুলস অব অরিজিন টেক্সট এবং পণ্যের তালিকা চূড়ান্তকরণের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদেশ।
এছাড়া সভায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকসমূহের (এমওইউ) বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্যে টেকনিক্যাল বাধা (টিবিটি) সংক্রান্ত বিষয়ে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক ভিসা, পেশাজীবী ও তাদের পরিবারের জন্য ভিসা এবং পর্যটন ভিসা সহজীকরণের মাধ্যমে পারস্পরিক যাতায়াত ও বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটন বৃদ্ধিতে একমত হয়। ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার জন্য উভয় দেশ সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, উভয় পক্ষ পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, পেমেন্ট সিস্টেম সহজীকরণ এবং নির্ভরযোগ্য লেনদেন ব্যবস্থাপনা জোরদারে একমত হন। এছাড়া নন-ট্যারিফ বাধা, পণ্যের মান পরীক্ষা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সম্ভাবনাময় পণ্যের জন্য বিশেষ প্রচারণার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় দুপক্ষ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত পোষণ করে।
একইসঙ্গে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উন্নয়ন জোরদারের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ট্রেড ফেয়ার, প্রদর্শনী ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ নিয়মিত বাণিজ্য মেলা আয়োজন, বাজার সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়।
এনএইচ/এসএনআর