বাজারের শৃঙ্খলা ফিরেছে, রমজানে আরও ভালো হবে: বাণিজ্য উপদেষ্টা
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন/ ফাইল ছবি
সরকারের সামগ্রিক নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ফলে দেশের বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরেছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। এছাড়া গত রমজানের তুলনায় আসন্ন রমজান আরও ভালো যাবে বলে আশা করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন উপদেষ্টা। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ চুক্তি সই নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।
টিআইবি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে- বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের এক ধাপ অবনতি হয়েছে। ১৪তম স্থান থেকে এবার বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩তম। দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া কি সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যর্থতা?- এমন প্রশ্নে বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, বিষয়টি তিনি এই প্রথম শুনলেন। এ ধরনের মূল্যায়নের উপকরণ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।
আর এক প্রশ্নের উত্তরে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, দুর্বৃত্তায়ন ও বাজারে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার সামগ্রিকভাবে কাজ করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন দপ্তর–সংস্থাগুলোতে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এর সুফল হিসেবে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, এখন আমদানির পরিমাণ এত বেশি যে জাহাজে করে পণ্য এনে বন্দরেই রাখতে হচ্ছে। এটা প্রমাণ করে যে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি নেই।
উপদেষ্টা আরও বলেন, আমার মনে হয় যে বাজারের শৃঙ্খলায় প্রকাশিত হয়েছে, বাজারের মূল্যমানে আমাদের কর্মকাণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। আমরা বারবার বলে এসেছি এবং এখনো আবার বলছি যে আগামী রমজান ইনশাল্লাহ গত রমজানের থেকেও ভালো হবে।
চা শিল্পে প্রাণ ফেরানো ও টিসিবির ভর্তুকি কমানো
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, দীর্ঘদিন অবহেলিত চা শিল্পে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সহায়তায় কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরেছে। একই সঙ্গে টিসিবির কার্যক্রমে সংস্কারের ফলে ভর্তুকির চাপ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে, যদিও উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি বলেন, ডিম, আলু, চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজার পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে নিয়মিত তদারকি ও অনুসন্ধান চলছে বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক ইস্যু
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। পাল্টা শুল্ক আরোপ হলে সেটি বাড়তে পারে। তবে সরকার কৌশলগত ‘ট্রেড-অফ’ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ৮৫-৮৬ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা মিলবে
ভুল হলে ক্ষমা করবেন, দয়া করে আমাকে ভুলে যাবেন
তিনি বলেন, কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক শূন্য থাকায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ালে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব।
উপদেষ্টা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা মিলবে। বাকি ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দুটি বড় অর্জন এসেছে। প্রথমত, শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৬ শতাংশ গার্মেন্টস পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শূন্য রেসিপ্রোকাল ট্যারিফে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বড় সুযোগ
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘কটন ফরওয়ার্ড’ ব্যবস্থায় শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। এর ফলে শুধু গার্মেন্টস নয়, দেশের টেক্সটাইল, স্পিনিং ও উইভিং সেক্টরও ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ। দেশের গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবহৃত তুলার মাত্র ২ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকি ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য যেমন উপযোগী, তেমনই এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও সহায়ক হবে।
চুক্তির এনফোর্সমেন্ট ও এক্সিট ক্লজ
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, এসব চুক্তিতে এনফোর্সমেন্ট ও এক্সিট ক্লজ যুক্ত করা হয়েছে। নোটিফিকেশনের তারিখ থেকে চুক্তি কার্যকর হবে এবং যে কোনো পক্ষ দুই মাসের নোটিশ দিয়ে চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা এমন কোনো চুক্তিতে যাইনি যেটা একতরফাভাবে বা বাধ্যতামূলকভাবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, আমাদের ব্যর্থতা নেই- এটা আমি বলবো না। আরও ভালো করা যেত। তবে সততা, পরিশ্রম আর নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে আমরা একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।
এমএএস/কেএসআর