শেয়ারবাজারে সক্রিয় হচ্ছেন বিদেশিরা, বেড়েছে শেয়ার কেনা
ফাইল ছবি
দেশের শেয়ারবাজারে সক্রিয় হচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। শেয়ার বিক্রির বদলে তারা শেয়ার কেনায় মনোযোগী হয়েছেন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির বিপরীতে ক্রয়ের পরিমাণ বেড়েছে।
চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিদেশিরা যে পরিমাণ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন, তার থেকে বেশি টাকার শেয়ার কিনেছেন। তবে এর আগে টানা পাঁচ মাস বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বেশি ছিল।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা থাকায় দেশি ব্যক্তিদের শেয়ার বিক্রির চাপ বেশি ছিল বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর থেকেই বিদেশিরা শেয়ার কেনার প্রতি মনোযোগী হন। যে কারণে চলতি বছরে শেয়ার বিক্রির থেকে কেনার পরিমাণ বেশি হয়েছে।
তারা বলছেন, বিদেশিদের শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি হওয়ার মানে এই নয় তারা বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন। তবে বিক্রির থেকে কেনা বেশি হলে বিনিয়োগ বাড়ানো বোঝায়। অবশ্য বিদেশিদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবধান দিয়ে নিট বিনিয়োগ বাড়া বা কমার হিসাব করা সম্ভব না।
উদাহরণ দিয়ে ডিএসইর এক সদস্য বলেন, ধরেন একজন বিনিয়োগকারী ১০০ টাকার শেয়ার কিনেছেন, সেই শেয়ারের দাম বেড়ে ২৫০ টাকা হলো। তারপর তিনি ১৫০ টাকার শেয়ার বিক্রি করলেন। তাহলে কি তিনি ৫০ টাকা বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন? নিশ্চয় তা নয়। তিনি মুনাফা তুলেছেন, কিন্তু নিট বিনিয়োগ তুলে নেননি।
তিনি বলেন, একজন নিট বিনিয়োগ পরিস্থিতি জানতে হলে তিনি কত টাকা বিনিয়োগ করেছেন এবং কত টাকা বিক্রি করে তুলে নিয়েছেন সেই তথ্য জানতে হবে। শেয়ার কেনার পর দাম কমে গেলে, টাকার অঙ্কে বিক্রির পরিমাণ কম হলেও বিনিয়োগ বেশি তুলে নেওয়া হয়। একইভাবে দাম বাড়লে বেশি বিক্রির পরও কম বিনিয়োগ তোলা হয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিদেশিরা ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন ১৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি ১৮ কোটি ১ লাখ টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিদেশিরা ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ১১৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার। অর্থাৎ শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি হয় ৮০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
তার আগের মাস নভেম্বরে বিদেশির ৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ১৭৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এতে শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি হয় ৭৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অক্টোবর মাসে বিদেশির ৯৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করে ২৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করে ২৯১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আর আগস্ট মাসে ১৬৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করে ২০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
টানা পাঁচ মাস শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি হলেও, এর আগের তিন মাসে বিদেশিদের কেনার পরিমাণ বেশি ছিল। এর মধ্যে জুলাই মাসে বিদেশিরা ৩৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন, বিপরীতে বিক্রি করেন ১৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
এর আগে জুন মাসে ১৯৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিদেশিদের বিক্রি ছিল ৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আর মে মাসে ২৬৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি ছিল ২৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
এছাড়া ২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিদেশিরা ১০৮ কোটি ৩০ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাসটিতে শেয়ার বিক্রির থেকে কেনার পরিমাণ বেশি ছিল ৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
তবে পরের তিন মাস বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বেশি ছিল। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ১২০ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করে ১৪৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকার।
পরের মাস মার্চে ৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি ছিল ১০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর এপ্রিল মাসে ১৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি ছিল ২৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাসে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির থেকে কেনার পরিমাণ বেশি ছিল। বাকি ৮ মাসে শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি ছিল। সব মিলিয়ে বছরটি বিদেশিরা ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৮ লাখ টাকা শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেছেন ২ হাজার ৯৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিক্রি বেশি ছিল ২৭০ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিয় নিয়ে কাজ করে এমন একটি ব্রোকারেজ হাউজের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, একজন বিনিয়োগকারী কখন শেয়ার কিনবে, আবার কখন বিক্রি করবে এটা তার নিজস্ব বিষয়। মুনাফা হলে লাভ তুলে নেওয়া স্বাভাবিক। আবার অনিশ্চয়তা পরিস্থিতি থাকলে বিক্রি বাড়াতে পারে।
তিনি বলেন, গত বছরের শেষদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট হবে কি হবে না তা নিয়েও শঙ্কা ছিল। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়েছে। ভোটের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর পরই শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিদেশিদের শেয়ার কেনা-বেচার তথ্য পর্যালোচনা করলে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এতে বাজারের প্রতি সবার আস্থা বাড়ছে। বিদেশিরা নিয়মিত বাজারের খোঁজখবর নিচ্ছেন। এটা খুব পজিটিভ বিষয়।
যোগাযোগ করা হলে ডিএসইর সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা থাকায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই নিষ্ক্রিয় ছিল। বিদেশিরাও শেয়ার বিক্রি বেশি করেছে। তবে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর থেকেই বিদেশিরা শেয়ারবাজারে সক্রিয় হয়েছেন, তাদের লেনদেনের চিত্র তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাই আমরা আশা করছি বাজারেও ওপর সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। সঠিক পরিকল্পনা নিতে পারলে সামনে শেয়ারবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বাড়বে।
এমএএস/এমআরএম