ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

ঈদের বাজার

টেরিবাজারে জমজমাট কেনাবেচা, গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়

মো. রফিক হায়দার | প্রকাশিত: ০৪:২৪ পিএম, ০১ মার্চ ২০২৬

ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসায় চট্টগ্রাম নগরে কাপড় কেনাবেচার ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার এখন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। বেলা গড়াতেই বাজারের সরু গলিতে ভিড় জমতে শুরু করে। সন্ধ্যা নামার পর তা রূপ নেয় মানুষের ঢলে। বেশির ভাগই আসেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। তাদের কেউ পছন্দের পোশাকটি পেতে দোকান থেকে দোকানে ঘুরে বেড়ান, কেউ আবার কাঙ্ক্ষিত জামাটি পেয়ে গেলে দরদাম করেন।

দেশের অন্যতম বড় পাইকারি কাপড়ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টেরিবাজার। সারাবছরই এখানে পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনা চললেও ঈদের সময় চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, ফেনী, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা বাজারটিতে আসেন। পাইকারি দামের কাছাকাছি মূল্যে পোশাক পাওয়া যায় বলে এখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে রঙের উৎসব। সারি সারি ঝুলছে উজ্জ্বল রঙের শাড়ি, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা ও পাঞ্জাবি। দোকানে সাজানো এসব নতুন নকশার পোশাক যেন নিজেই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। কোথাও আবার দোকানিরা ডেকে ডেকে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। সন্ধ্যা নামার পর বাজারের এই পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আলোয় আলোকিত দোকান, মানুষের কোলাহল, দরদামের তর্ক আর শিশুদের উচ্ছ্বাস- সব মিলিয়ে পুরো বাজারজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

বিক্রেতারা জানান, পাকিস্তানি লন ও এমব্রয়ডারি থ্রি-পিস, ভারতীয় শাড়ি, দেশীয় বুটিক পোশাক, পাঞ্জাবি ও শিশুদের জামা বেশি বিক্রি হচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে হালকা রঙের কটন ও সিল্কের পোশাকের চাহিদা বেশি। কিশোরী ও তরুণীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নতুন নকশার শাড়ি, থ্রি-পিস ও গয়না। পুরুষদের পাঞ্জাবি, শার্ট, জিনসের প্যান্ট ও জুতা বিক্রি হচ্ছে ব্যাপকহারে। শিশুদের জন্য খেলনা ও সাজসজ্জার সামগ্রীর দোকানগুলোতেও ভিড় দেখা গেছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ঈদের বাজারেও। বিশেষ করে শাড়ি, গয়না ও প্রসাধনীর দাম বেড়েছে। অন্যদিকে বিক্রেতাদের দাবি, দাম গত বছরের মতোই রয়েছে। কিছু কিছু পণ্যে দাম বেড়েছে। তবে আনন্দঘন পরিবেশে এ নিয়ে খুব একটা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে না।
 টেরিবাজারে জমজমাট কেনাবেচা, গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়

দল বেঁধে কেনাকাটা
চান্দগাঁও এলাকা থেকে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছেন গৃহিণী রাহেলা বেগম। হাতে মেয়ের জামা আর ছেলের পাঞ্জাবি নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই ঈদের আগে এখানে আসি। এক জায়গায় পরিবারের সবার জন্য পোশাক পাওয়া যায়। শপিংমলে গেলে দাম বেশি পড়ে, এখানে দরদাম করার সুযোগ আছে।’

কলেজপড়ুয়া হুমায়ুন কবির বিজয় বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের পোশাক দেখতে এসে বলেন, ‘অনলাইনে অনেক কিছু দেখা যায়, কিন্তু কাপড়ের মান বোঝা যায় না। এখানে এসে হাতে নিয়ে দেখা যায়, তাই টেরিবাজারেই কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’

আরেক ক্রেতা রেহেনা আকতার মুক্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘মেগামার্টে এসেছি পরিবারের সবার জন্য শপিং করবো। তিন হাজার টাকায় থ্রি-পিস কিনেছি। নতুন কালেকশনে দাম বেশি। তবে চট্টগ্রামের অন্যান্য মার্কেটের তুলনায় এখানে দাম মোটামুটি কম।’

বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মেগামার্টের শহীদুল নামের এক কর্মী জানান, ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটায় বিশেষ ছাড় চলছে। পাঁচ হাজার টাকার থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে চার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। আড়াই হাজার টাকার থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে ১৮শ টাকায়।

টেরিবাজারে বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, থ্রি-পিস ৫৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা, শাড়ি ২৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা, পাঞ্জাবি ৫০০ টাকা থেকে সাত হাজার টাকা এবং জিনস প্যান্ট ৬০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
 টেরিবাজারে জমজমাট কেনাবেচা, গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়

বিকেল থেকে বাড়ে চাপ
বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের শুরুতে বেচাকেনা কম থাকলেও এখন প্রতিদিনই ভালো বিক্রি হচ্ছে। বিকেলের পর থেকে ক্রেতার চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেক দোকান রাত ১১টা কিংবা মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা রাখতে হচ্ছে। তারা আশা করছেন, ঈদের আগের শেষ সপ্তাহে বেচাকেনা আরও বাড়বে।

ব্যবসায়ী নুরুল কবির বলেন, ‘বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিনই ভালো বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের দিকে ভিড় বেশি হয়। ক্রেতারা নতুন ডিজাইন খোঁজেন। তাই ঈদের আগে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নতুন পোশাক এনেছি।’

দামের বিষয়ে ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বাড়ায় কিছু পোশাকের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ঈদ উপলক্ষে অনেক দোকানে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্রেতারা আকৃষ্ট হন।

কক্সবাজার থেকে পাইকারি কাপড় কিনতে আসা ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের আগে এখান থেকে কাপড় কিনে নিয়ে যাই। এখানকার দাম তুলনামূলক কম, ডিজাইনও নতুন পাওয়া যায়। এতে আমাদের ব্যবসায় সুবিধা হয়।’
 টেরিবাজারে জমজমাট কেনাবেচা, গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়

বাজার কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ঈদের মৌসুমই তাদের বছরের প্রধান ব্যবসার সময়। তাই পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল মনসুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবারের ঈদে ক্রেতাদের কেনাকাটায় আগ্রহ বাড়ছে। আমরা দোকান-মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি, যেন ক্রেতারা নির্বিঘ্নে ক্রয় করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে। কেউ যাতে গলাকাটা দাম না নেন সেজন্য আমাদের মনিটরিং টিম মাঠে কাজ করছে। গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে আমরা কাজ করছি।’

এভাবেই ক্রেতাদের পদচারণায় প্রতিদিনই নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার, যেখানে রঙিন কাপড়ের ভাঁজ খুলে দেখার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ঈদের আনন্দ।

এমআরএএইচ/একিউএফ