ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত

দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ‘শঙ্কা’, বিকল্প উৎসের সন্ধান

ইকবাল হোসেন | প্রকাশিত: ১১:৪৫ এএম, ০৩ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে আপাতত সংকট না থাকলেও বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সংকট মোকাবিলায় বিকল্প খুঁজছে সরকার।

বাংলাদেশে প্রয়োজনের প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। এর মধ্যে বড় অংশের জ্বালানি আমদানি করতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি নিয়ে মহাসংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনার কথাও বলছে সরকার।

ইতোমধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইরান। আরামকোতে হামলার পর আরেক জ্বালানি কেন্দ্র রাস তানুরা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে সৌদি সরকার। পাশাপাশি আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইনসহ আমিরাতের দেশগুলোতে অব্যাহত মিসাইল ও ড্রোন হামলায় পুরো সংকট আরও দীর্ঘতর হচ্ছে।

আমাদের হাতে এখন ১৫ দিনের মতো জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে আমাদের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের জন্য সমস্যায় পড়তে হবে না। কারণ আমাদের পরিশোধিত জ্বালানির বেশিরভাগ আমদানি হয় সিঙ্গাপুর, চায়না, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।-বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান

হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিপিং ডেটা বা জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির দুই প্রবেশমুখে বর্তমানে শত শত জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে।

জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ১৫০টি বিশালাকার ট্যাংকার এখন হরমুজ প্রণালির বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর করে অবস্থান করছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া প্রণালির অপর প্রান্তেও কয়েক ডজন জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে।

পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে ওমান উপসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে জাহাজ আসে। গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে অচলাবস্থার কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশে জ্বালানি চাহিদা ও মজুত

দেশে ৭২-৭৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। এর ৯৮ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিতসহ পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, জেড ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে হয়।

জ্বালানি মজুত

২ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, বিপিসির মালিকানা ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডিপোতে ৪ লাখ ২০ হাজার ৭৬৫ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল রয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ১২৭ টন। যা দিয়ে দেশে ১৪ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাছাড়া ৩৪ হাজার ১৩৩ টন অকটেন, যা দিয়ে ৩০ দিন, ২১ হাজার ৭০৫ টন পেট্রোল, যা দিয়ে ২০ দিন, ৩৮ হাজার ৭৭৭ টন জেট ফুয়েল, ১৬ হাজার ৫৪৮ টন কেরোসিন, ৭৮ হাজার ২৭৮ টন ফার্নেস অয়েল, ৬ হাজার ২৭৫ টন মেরিন ফুয়েল মজুত রয়েছে।

চলতি মাসে আরও ৪ লাখ টনের মতো ডিজেল আসার কথা রয়েছে। পাশাপাশি চলতি মাসে এক লাখ টনের ক্রুড অয়েল আসার কথা। জিটুজি পদ্ধতির এ আমদানির ক্রুড বোঝাই করতে গিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়েছে নর্ডিক পোলাক নামের ট্যাংকার জাহাজটি।

আমরা বিকল্প অনেক উৎস থেকে এলপিজি আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের প্রভাব অনেক বড়। যার নেতিবাচক প্রভাব সারাবিশ্বে পড়বে। আমাদেরও এ প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে।-লোয়াব সভাপতি আমিরুল হক

বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের হাতে এখন ১৫ দিনের মতো জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে আমাদের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের জন্য সমস্যায় পড়তে হবে না। কারণ আমাদের পরিশোধিত জ্বালানির বেশিরভাগ আমদানি হয় সিঙ্গাপুর, চায়না, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অপরিশোধিত ক্রুডগুলো আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এ মাসে এক লাখ টন ক্রুডের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। জাহাজটি ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসার কথা। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারাবিশ্বে এর প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশেও এ প্রভাবের বাইরে নয়।’

আরও পড়ুন

আপাতত তেল-এলএনজির সংকট নেই, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে আটকা ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’
যে সব কারণে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতন

তবে ক্রুড অয়েল পরিবহনের জাহাজটি ১-৩ মার্চের মধ্যে লোড হওয়ার কথা থাকলেও সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কেন্দ্র আরামকোতে হামলার পর রাস তানুরা জ্বালানি কেন্দ্রও সাময়িক বন্ধ করে দেয় সৌদি সরকার। বিপিসির আমদানি করা ক্রুড অয়েল পরিবহন করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। কথা হলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক সোমবার দুপুরে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিপিসির ক্রুড অয়েলগুলো আমরা পরিবহন করি। এক লাখ টন ক্রুড লোড করতে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আছে আমাদের চার্টারের একটি জাহাজ। কিন্তু আরামকোতে ইরানের মিসাইল হামলার পর রাস তানুরা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি সরকার। এখন আমাদের জাহাজটিতে ক্রুড লোড করা সম্ভব হয়নি। জাহাজটি এখন রাস তানুরাতে অবস্থান করছে।’

তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে ক্রুড না এলে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে পুরো জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব তৈরি করবে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমাদের জ্বালানির সরবরাহ চেইনের আপাতত কোনো আশঙ্কা নেই। হরমুজ প্রণালি অফিসিয়ালি বন্ধ করেনি ইরান। যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমাদের জ্বালানি আমদানিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। সেই সংকট মোকাবিলায় আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা নিচ্ছি।-বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির সহ-মহাব্যবস্থাপক (শিপিং) শাহিনুর তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের ক্রুড আনার জন্য নর্ডিক পোলাক নামের জাহাজটি রাস তানুরা বন্দরে গেছে। আজকালের মধ্যে এটি লোড হওয়ার কথা ছিল। লোড হলে এটিকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসতে হবে। এখন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে হবে।’

তবে বর্তমানে মজুত থাকা ক্রুড দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির প্ল্যান্ট আরও এক মাস চালানো যাবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত।

এলপিজির হালচাল

জানা যায়, দেশে ১৬ লাখ টনের বেশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা রয়েছে। এলপিজির ৯৮ শতাংশ রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে ১ লাখ ৩২ হাজার ২৪৯ টন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৫১ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। ২০২৫ সালের চেয়ে এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ২৯ হাজার ২৪৫ টন এলপিজি বেশি আমদানি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব এলপিজি আমদানি হয়। নানান সংকটের কারণে দেশে এলপিজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ভোক্তারা অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হন। এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশ এলপিজি সরবরাহ চেইনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা হলে লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে চলমান এলপিজি সংকট মোকাবিলায় আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ফেব্রুয়ারিতে আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২৯ হাজার টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। অপারেটর পর্যায় থেকে সরকার নির্ধারিত দামে আমরা ডিলার ডিস্ট্রিবিউটরদের এলপিজি সরবরাহ করে আসছি। সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে খুচরা পর্যায়ে অতি মুনাফালোভী তৎপরতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।’

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিকল্প অনেক উৎস থেকে এলপিজি আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের প্রভাব অনেক বড়। যার নেতিবাচক প্রভাব সারাবিশ্বে পড়বে। আমাদেরও এ প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে।’

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৩৮শ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে দৈনিক ২৬শ থেকে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। চাহিদার অবশিষ্ট গ্যাস এলএনজির মাধ্যমে আমদানি করতে হয়।

পাইপলাইনের মাধ্যমে গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন ও শিল্পে এসব গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। দেশে গ্যাসের মোট চাহিদার ৩০-৩৫ শতাংশ এলএনজি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি করে। পাশাপাশি বৈশ্বিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনে পেট্রোবাংলা।

চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ২৩ লাখ ৩৭ হাজার টন এলএনজি আমদানি হয়েছে। এসব এলএনজির ৬৫ শতাংশই এসেছে কাতার থেকে। হরমুজ প্রণালি হয়েই এসব গ্যাস বাংলাদেশে এসেছে।

এ বিষয়ে কথা হলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন্স) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখনো এলএনজিবাহী তিনটি কার্গো পথে রয়েছে। এগুলো হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে এসেছে। এগুলো দিয়ে দুই সপ্তাহ সরবরাহ দেওয়া যাবে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা তৈরি করবে।’

সরকারের উদ্যোগ

দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও সংকট মোকাবিলায় সরকারও পরিকল্পনা নিয়েছে। সংকট তৈরি হলে বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির কথা ভাবা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমাদের জ্বালানির সরবরাহ চেইনের আপাতত কোনো আশঙ্কা নেই। হরমুজ প্রণালি অফিসিয়ালি বন্ধ করেনি ইরান। যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমাদের জ্বালানি আমদানিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। সেই সংকট মোকাবিলায় আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা নিচ্ছি। জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎস নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।

এমডিআইএইচ/এএসএ