ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

যুদ্ধের ধাক্কা লাগতে পারে প্রবাসী আয়ে

জেসমিন পাপড়ি | প্রকাশিত: ০৪:৪৬ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২৬

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা কেন্দ্র করে অশান্ত গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এ অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সংকীর্ণ হবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। চাপ বাড়বে প্রবাসী আয়ে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশ বড় চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সরাসরি সামরিক নয়, বরং দেশের জ্বালানি, শ্রম ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা, রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া ও অভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজ ধ্বংসের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ওই পথ দিয়ে পণ্য পরিবহন কমে যেতে পারে।’

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেলের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহেও সংকট তৈরি হতে পারে। কাতার থেকে গ্যাসবাহী ট্যাংকার চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়বে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।-সাবেক কূটনীতিক আব্দুল হাই

তার মতে, প্রথম ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজারে। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে। পরিবহন, যোগাযোগ ও উৎপাদন—সবখানেই জ্বালানির প্রয়োজন। এতে আমদানি-রপ্তানির খরচ বাড়বে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এরপর একটি ডোমিনো ইফেক্ট তৈরি হবে, যেখানে একটির পর একটি পণ্যের দাম বাড়তে থাকবে। রমজানে বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হবে।’

ইরানের পাল্টা হামলার পর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা করেছে। ফলে ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে জানা যায়।

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত/দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ‘শঙ্কা’, বিকল্প উৎসের সন্ধান
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত/আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার ছায়া
ইরান যুদ্ধে কত খরচ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের?

সাবেক আরেক কূটনীতিক আব্দুল হাই জাগো নিউজকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেলের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহেও সংকট তৈরি হতে পারে। কাতার থেকে গ্যাসবাহী ট্যাংকার চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়বে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।’

মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। ‘যেসব পণ্য বা জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে, সেগুলো অন্য দেশ থেকে আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন,’ বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাইমন মহসীন বলেন, ‘সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বা বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের জন্য প্রধান ঝুঁকি হবে জ্বালানিনির্ভরতা। আমদানিনির্ভর তেলের দাম স্থায়ীভাবে বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি ও ভর্তুকির চাপ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বা উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়বে। যার প্রভাব খাদ্যদ্রব্যের দাম, উৎপাদন ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।’

তার মতে, লোহিত সাগর বা উপসাগরীয় নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে সামুদ্রিক বিমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যা রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী থাকায় তাদের যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। নতুন কর্মীরা কাজে যোগ দিতে পারছেন না। ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে কর্মরত দুই বাংলাদেশি নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।

কূটনীতিক আব্দুল হাই বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে, যার ফলে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কমার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের রপ্তানিও কমতে পারে।’

বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি সরাসরি সামরিক নয়, বরং বাজার, অভিবাসন ও জনমতের মাধ্যমে আসা পরোক্ষ অভিঘাত। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।-সাইমন মহসীন

সরকারি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলেও উদ্বেগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হলে তা ব্যবস্থাপনাযোগ্য থাকবে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। বর্তমান অস্থিরতার প্রকৃত আফটারশক ছয় মাস বা এক বছর পর দেখা যেতে পারে।’

তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। তাই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সব মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তা নবায়ন, আহত বা নিহতদের ক্ষতিপূরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাত কত দূর বিস্তার লাভ করে তার ওপর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত থাকলে জনমত আবেগপ্রবণ হলেও তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে আদর্শিক উত্তেজনা, অনলাইন উগ্র বক্তব্য ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।

সাইমন মহসীনের ভাষায়, বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি সরাসরি সামরিক নয়, বরং বাজার, অভিবাসন ও জনমতের মাধ্যমে আসা পরোক্ষ অভিঘাত। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

জেপিআই/এএসএ