ডুবন্ত শেয়ারে উল্টো স্রোত, ১০ লাখ টাকায় দুই মাসেই কোটিপতি!
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
দেশের শেয়ারবাজারে যেন হঠাৎ করেই হাজির হয়েছে রূপকথার গল্প। যেখানে লোকসানে ডুবে থাকা একটি কোম্পানির শেয়ার হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘আলাদিনের চেরাগ’। মাত্র দুই মাসে কয়েকগুণ নয়, ১০ গুণ বেড়েছে একটি শেয়ারের দাম। এতে ১০ লাখ টাকার বিনিয়োগ মাত্র দুই মাসেই কোটি টাকা হয়ে গেছে!
লোকসানে নিমজ্জিত পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস শেয়ার নিয়ে এমনই এক অস্বাভাবিক উত্থানের গল্প এখন বিনিয়োগ অঙ্গনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত ১৪ জানুয়ারি কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ৩৮ পয়সা। সেখান থেকে টানা উত্থানে ১৬ মার্চ এসে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৮০ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ৩ টাকা ৪২ পয়সা, যা শতাংশের হিসাবে ৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
এই উত্থানের প্রভাব কেমন হতে পারে- তা বোঝাতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। কেউ যদি জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনতেন, তাহলে দুই মাসের মাথায় এখন সেই বিনিয়োগের বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা ১০ লাখ টাকায় দুই মাস বিনিয়োগ করেই মুনাফা হয়েছে ৯০ লাখ টাকা। বাস্তবের শেয়ারবাজারে এমন ঘটনা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য, আবার কারো কাছে বিরল সুযোগ।
তবে এই উত্থানের পেছনের বাস্তবতা মোটেও রূপকথার মতো নয়। বরং কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তি বেশ দুর্বল। দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এ কারণে এটি শেয়ারবাজারের পচা ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির তালিকায় রয়েছে।
সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৭৭ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ টাকা ৯০ পয়সা। অর্থাৎ লোকসানের পরিমাণ সামান্য কিছুটা কমেছে। তবে এখনো বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছে কোম্পানিটি।
অতীতে অবশ্য কোম্পানিটি কিছু লভ্যাংশ দিয়েছিল। ২০১৪ সালে ১০ শতাংশ, ২০১৩ সালে ১০ শতাংশ, ২০১২ সালে সাড়ে ১২ শতাংশ, ২০১১ সালে ১০ শতাংশ এবং ২০১০ সালে ৭৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে আর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি।
শেয়ারের এই অস্বাভাবিক উত্থানের আগে ছিল তীব্র পতনের ইতিহাসও। ২০২৪ সালের ২৪ মার্চ প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৫ টাকা ১০ পয়সা। সেখান থেকে ক্রমাগত পতনে তা নেমে আসে মাত্র ৩৮ পয়সায়। এরপরই শুরু হয় হঠাৎ এই উল্লম্ফন।
এমন একটি লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের দাম কেন এবং কীভাবে এত দ্রুত বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে? আরও বিস্ময়ের বিষয়, এ নিয়ে এখনো পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে কোনো সতর্কবার্তা জারি করা হয়নি।
২০০৫ সালে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ২৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের সংখ্যা ২৮ কোটি ৫৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৯৭টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ শেয়ার, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৭৩ দশমিক ২০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৮ শতাংশ এবং বিদেশিদের কাছে দশমিক ৬৫ শতাংশ।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, শেয়ারবাজারে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের জন্য যেমন লোভনীয়, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও। কারণ মৌলভিত্তি দুর্বল থাকলে এই উত্থান যে কোনো সময় বড় ধরনের পতনে রূপ নিতে পারে।
তিনি বলেন, পিপলস লিজিং দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। যে কারণে দীর্ঘদিন শেয়ারবাজারে লেনদেনও বন্ধ থাকে। বর্তমানেও কোম্পানিটি লোকসানে রয়েছে। এমন কোম্পানির শেয়ার দাম এখন যেভাবে বাড়ছে, তা কিছুতেই স্বাভাবিক নয়। এই দাম বাড়ার পেছনে নিশ্চয় কোনো গ্রুপ আছে।
পুরোনো ইতিহাস
নানা সংকটে থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কার্যক্রম ২০১৯ সালে বন্ধ করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যে কারণে অনেক শেয়ারহোল্ডার পানির দরে কোম্পানিটির শেয়ার বিক্রি করে দিতে চান। কিন্তু ক্রেতার অভাবে হতাশ হতে হয় তাদের। সে সময় নামমাত্র অর্থে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দিলেও ক্রেতার অভাবে শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি শেয়ারহোল্ডাররা।
এমন পরিস্থিতিতে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ করে দেয় ডিএসই। প্রায় ৫ বছর লেনদেন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ১০ মার্চে শেয়ারবাজারে আবার কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন চালু হয়।
এমএএস/এসএইচএস