ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

প্রাক্-বাজেট আলোচনা

সতর্ক ও রক্ষণশীল বাজেটের পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ৩০ মার্চ ২০২৬

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সতর্ক ও রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়া, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এবার বড় আকারের ব্যয়মুখী বাজেট ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে হবে।

শনিবার (২৮ মার্চ) রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় এসব মতামত তুলে ধরেন তারা।

বৈঠকে অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে অংশ নেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ফাহমিদা খাতুন, জাকির আহমেদ খান, এ কে এনামুল হক, মনজুর হোসেন, সেলিম রায়হান, মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, মাহবুব আহমেদ ও মামুন রশীদসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

বাস্তবতানির্ভর বাজেটের তাগিদ

অর্থনীতিবিদরা বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের ব্যয়মুখী বাজেট এখন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

সতর্ক ও রক্ষণশীল বাজেটের পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী সবার মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পের অতিমূল্যায়ন কমানো ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকল্প প্রণয়নের সময়ই অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়। এ কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করতে হবে।

রাজস্ব ঘাটতি বড় উদ্বেগ

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মত দেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, করের আওতা বাড়ানো, এনবিআরের আধুনিকায়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সংস্কারবিরোধী প্রতিরোধ মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে।

সুদের হার কমানোর সুযোগ নেই

নীতি সুদহার নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বর্তমানে সুদের হার কমানোর সুযোগ নেই। কারণ, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়লে তা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।

প্রবাসী আয় ও জ্বালানি ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে প্রবাসী আয়ে ধাক্কা লাগতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পাবে, যা বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

সামাজিক সুরক্ষা ও নির্বাচনি অঙ্গীকার

এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় নির্বাচনি অঙ্গীকারের প্রতিফলন রাখার ওপর জোর দেন অর্থনীতিবিদরা। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে টেকসই অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত বার্তার প্রয়োজন

বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় বৈঠকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দেওয়া জরুরি।

সার্বিকভাবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বাস্তবতানির্ভর, সংযত ও কাঠামোগত সংস্কারসমৃদ্ধ বাজেট প্রণয়নই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উপযোগী হবে।

কেমন হতে পারে বাজেট

এদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার একটি বড় বাজেট প্রস্তুত করতে চাচ্ছে সরকার। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।

সূত্রটি জানিয়েছে, বাজেটের এই আকার এখনো চূড়ান্ত নয় এবং নতুন দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার চাইলে এতে পরিবর্তন আনতে পারে। 

সূত্র আরও জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেও বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯.৪ শতাংশ। এর মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা এবং নন-ট্যাক্স রেভিনিউ (এনটিআর) খাত থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। কর বহির্ভূত রাজস্ব হতে পারে ২১ হাজার কোটি টাকা।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। যার মধ্যে ব্যাংক খাত ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ শতাংশ। মোট জিডিপির আকার দাঁড়াতে পারে ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন।

 এমএএস/এসএনআর