কর্মীদের আয়কর থেকে দায়মুক্তি চায় নোয়াব
এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে প্রাক-বাজেট আলোচনায় নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতারা, ছবি: জাগো নিউজ
নিউজপ্রিন্টের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার, সংবাদপত্রে কর্পোরেট কর হার কমিয়ে ১০ শতাংশ, নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার ও কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির পক্ষে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় নোয়াবের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন নোয়াব সভাপতি মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। এসময় আরও বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান।
নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, দেশের অনেক রপ্তানিমুখী বা বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্প বর্তমানে ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ কর্পোরেট কর সুবিধা ভোগ করলেও সংবাদপত্র শিল্পকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। সমাজ গঠনে সংবাদপত্রের অনন্য ভূমিকা ও বর্তমান আর্থিক সংকটের নিরিখে, এই শিল্পকেও সমপর্যায়ের কর সুবিধা প্রদান করা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং নীতিগতভাবে সংগত। তাই ২০২৬-২০২৭ সালের বাজেটে সংবাদপত্রের কর্পোরেট কর হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে নোয়াব সভাপতি বলেন, আয়কর আইন ২০২৩ এর ৮৬ ধারা অনুসারে সরকারিসহ সব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা নিজের আয়কর নিজে প্রদান করেন। এটা রাষ্ট্রের অন্যতম নীতি। অথচ সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ড অনুসারে কর্মীর আয়ের ওপর প্রযোজ্য আয়কর প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হয়। দেশে এমন কোনো আইন থাকা উচিত নয় যা সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য নয়।
কর্মীদের আয়কর না দেওয়ার দাবির প্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ওয়েজবোর্ডের অর্ডারনামায় উল্লেখ আছে যে সংবাদপত্রের মালিকরা ট্যাক্স দেবেন—এমন একটি বিষয় প্রচলিত আছে। কিন্তু বাস্তবে এটি হওয়া উচিত নয়। ট্যাক্স দেওয়ার দায়িত্ব কর্মীদেরই হওয়া উচিত এবং তাদের বেতন থেকেই আয়কর কাটা হবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে নতুন ওয়েজবোর্ড হলে আমরা এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরব, যাতে কর্মীদের আয়কর কর্মীরাই দেন—এই নীতিটি বহাল থাকে।’
তিনি ইঙ্গিত দেন, এক্ষেত্রে বেতন কাঠামোতেও প্রভাব পড়বে। কারণ আগে যদি মালিকপক্ষ ট্যাক্স দিয়ে থাকে, এখন কর্মীদের নিজস্ব আয় থেকে কর দিতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বেতন বাড়ানোর দাবি উঠবে।
এদিকে, নোয়াবের প্রস্তাবে আরও বলা হয়, নিউজপ্রিন্টের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং উচ্চ আমদানি নির্ভরতার কারণে সংবাদপত্র শিল্পের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বর্তমানে শিল্পটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সংবাদপত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর বর্তমানে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং ৭.৫ অগ্রিম কর (এটি) পরিশোধ করতে হয়। পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয়সহ নিউজপ্রিন্টের ল্যান্ডেড কস্ট প্রায় ১৩০ শতাংশ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়। এ প্রেক্ষাপটে নিউজপ্রিন্টের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
উৎস কর ও অগ্রিম আয়কর অব্যাহতি জানিয়ে নোয়াবের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আয়কর আইন ২০২৩-এর ৯২ ধারা অনুসারে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎস কর ৫ শতাংশ এবং ১২০ ধারা অনুযায়ী কাঁচামালের আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মিলে হয় ১০ শতাংশ। অথচ সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের ১০ শতাংশ লাভ থাকে না। অগ্রিম প্রদত্ত আয়কর, বছর শেষে প্রদেয় আয়করের সঙ্গে সমন্বয় সম্ভব হচ্ছে না।
এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘কর্পোরেট করের হার হ্রাসের ব্যাপারে আমি যেটা গতবারও আপনাদের কিছু কমিটমেন্ট দিয়েছি এবং আমি রেখেছি। এবারও যে কমিটমেন্ট দিব সেটা কিন্তু রাখার চেষ্টা করবো। আমি অর্থমন্ত্রীকে বলবো যে, স্যার এটা করা উচিত বা এটা করলে ভালো হয়। কর্পোরেট ট্যাক্সের ক্ষেত্রে একটা কমিটমেন্ট দিতে পারি যে রেট আর বাড়বে না। এটা কমানো যাবে কিনা সেটা বলা খুবই মুশকিল কারণ আমাদের প্রচুর রেভিনিউ বাড়ানোর লক্ষ্য আছে।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আর মূল্য সংযোজন করের ওপরে যেটা বলা হয়েছে এখানে বেশ কিছু যৌক্তিক বিষয় আছে। এখানে আমি কিছু একটা করবো আপনাদের পক্ষে। এটা আপনারা নিশ্চিত থাকেন এবং সেটা আমি আজকেই আমাদের বাজেট টিমকে বলব যে এই এই জিনিসটা তোমরা প্রস্তাব করো মহান সংসদে আমরা উপস্থাপন করবো।’
ইএইচটি/এমএমএআর