ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নিয়ে থামছে না নৈরাজ্য

মো. নাহিদ হাসান | প্রকাশিত: ০৫:৪৯ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬

সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই বাজারে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। বর্তমানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩শ ৪১ টাকা নির্ধারিত থাকলেও খুচরা পর্যায়ে তা দুই হাজার থেকে ২২শ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ নৈরাজ্য থামাতে নির্বিকার সরকারি সংস্থাগুলো।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৬শ থেকে ৭শ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা এ সুযোগ নিচ্ছেন।

ভোক্তাদের অভিযোগ, দোকানিরা বলছেন সরবরাহ কম, তাই বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে। তবে বাস্তবে এই ঘাটতির কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং ‘প্যানিক বায়িং’-এর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

কোম্পানি থেকে রেট বাড়ানো হয়েছে। ১২ কেজির এলপিজিতে ৪শ থেকে ৪শ ৫০ টাকা বাড়তি দাম দিয়ে আমাদের কিনতে হচ্ছে। সরকারি দামে আমরাই এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারি না।-এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি আমানত উল্লাহ

লালবাগের বাসিন্দা আকরাম হুসাইন বলেন, আজ সকালেও ২১শ ৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। গত মাসে ১৫শ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। সরকারি রেট তো আরও কম। সরকার নির্ধারিত দামে কোনোদিন সিলিন্ডার কিনতে পারি না। সব সময় ২শ থেকে ৭শ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়। তাহলে দাম নির্ধারণের দরকার কী!

আরও পড়ুন

ডিলার সিন্ডিকেটেই বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারে কার ভাগে কত টাকা?
সরকারি দাম তোয়াক্কা না করেই বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস

উত্তরার আব্দুল্লাহপুরের বাসিন্দা নাজির বলেন, তিন-চার দোকান ঘুরে কোথাও কম দামে সিলিন্ডার পেলাম না। ২২শ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হলো। কম টাকা বেতনের চাকরি করি। সিলিন্ডারেই যদি দুই হাজারের বেশি চলে যায়, সংসার চালাবো কীভাবে।

এ বিষয়ে একাধিক খুচরা বিক্রেতা জানান, তারা ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে গ্যাস কিনছেন। ফলে বাধ্য হয়েই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি সমন্বয়হীনতা ও নজরদারির ঘাটতির ফল।

এসব অনিয়ম প্রতিরোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। তারা এখন পর্যন্ত একজনেরও লাইসেন্স বাতিল করেনি। প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর এ সব প্রতিষ্ঠান যেখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে তার মানে সরকার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম

আজিমপুরের এলপিজি খুচরা ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের বলা হচ্ছে এলপিজির সরবরাহ কম এজন্য দাম বেড়েছে। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে আমাদের। তাই বিক্রিও বেশি দামে করছি। সরবরাহ কম নাকি বেশি—এসব ওপরের খবর আমরা জানি না।

টঙ্গীর খুচরা এলপিজি ব্যবসায়ী মিঠু বলেন, ‘১২ কেজির সিলিন্ডার ২২শ টাকা। এর কম নাই। বাজারে গ্যাস কম এজন্য দাম কিছুটা বাড়ছে।

এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি আমানত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোম্পানি থেকে রেট বাড়ানো হয়েছে। ১২ কেজির এলপিজিতে ৪শ থেকে ৪শ ৫০ টাকা বাড়তি দাম দিয়ে আমাদের কিনতে হচ্ছে। সরকারি দামে আমরাই এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারি না। আগে তো ১৫শ-১৬শ টাকায় বিক্রি হতো। গতকাল হঠাৎ দাম বাড়ানো হয়েছে। এজন্য বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।’

প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। আমরা সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসক, ভোক্তা অধিদপ্তরকে জানিয়ে দেই। দাম যাতে বেশি নিতে না পারে সেজন্য লোয়াবও সক্রিয়। দাম বাড়ার বিষয়টি আমাদের মনিটরে রাখতে হবে, আমি উচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে কথা বলবো।-বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব অনিয়ম প্রতিরোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। তারা এখন পর্যন্ত একজনেরও লাইসেন্স বাতিল করেনি। প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর এ সব প্রতিষ্ঠান যেখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে তার মানে সরকার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বিইআরসির বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়ে রেখেছি, তাদের আমরা বয়কট করেছি। আজ সরকার সে জায়গায় পরিবর্তন আনেনি যে সব অলিগার্কে (গুটিকয়েক সম্পদশালী ব্যবসায়ীর একটি গোষ্ঠী) পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এ প্রক্রিয়াটা আরও বেশি হয়েছে। তারা এসব অবস্থাকে উসকে দিয়েছে এবং অসাধু বাজার ব্যবস্থা জ্বালানি খাতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত করেছে।’

‘এখনো যদি সরকার না বোঝে লোক বদলিয়ে এসবের প্রতিকার করতে হবে। এসব প্রতিকার করার দায়িত্ব সরকারের। মানে প্রতিযোগিতা কমিশন, বিইআরসি, ভোক্তা অধিদপ্তর, বিএসটিআই— এরা সবাই সবার জায়গা থেকে যদি এগুলো প্রোটেক্ট করে এবং যারা এভাবে অসাধু ব্যবসা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।’

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘বাজার থেকে অসাধু ব্যবসায়ীদের উৎখাত করতে হবে। দরকার হলে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে লাইসেন্স নতুন করে দিতে হবে। এই ব্যবসা কারও ব্যক্তিগত কোনো ব্যবসা না। পৈতৃক ব্যবসাও না। এই ব্যবসা করার জন্য রাষ্ট্র তাদের দাসখত লিখে ব্যবসা করতে দেয়নি যে তারা যত খুশি দাম বাড়াবে, ইচ্ছামতো বিক্রি করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে না।’

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মার্চ মাসে ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজির সাপ্লাই হয়েছে। এটি অন্য মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। সাপ্লাই নিয়ে টেনশনের কিছু নেই।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। আমরা সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসক, ভোক্তা অধিদপ্তরকে জানিয়ে দেই। দাম যাতে বেশি নিতে না পারে সেজন্য লোয়াবও সক্রিয়। দাম বাড়ার বিষয়টি আমাদের মনিটরে রাখতে হবে, আমি উচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে কথা বলবো।’

এনএস/এএসএ