ভিডিও EN
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

ভারতের চিনি রপ্তানি সীমিত করার প্রভাব বাজারে

ইকবাল হোসেন | প্রকাশিত: ০৯:৪৫ পিএম, ২৫ মে ২০২২

# চাহিদার ৯৬ শতাংশ চিনি আমদানি করতে হয়
# অপরিশোধিত চিনির ৪৯ শতাংশ আসে ভারত থেকে
# ভারত রপ্তানি বন্ধ করলে সংকটে পড়বে বাংলাদেশ
# রোজায় কমানো সম্পূরক শুল্ক ফের বেড়েছে

ভোজ্যতেল ও গমের পর এবার আলোচনায় অন্যতম ভোগ্যপণ্য চিনি। দেশের মোট চাহিদার তুলনায় চিনির উৎপাদন অতি নগন্য। প্রায় ৯৬ শতাংশ চিনিই আমদানি করে মেটাতে হয় চাহিদা। অপরিশোধিত চিনির একটি বড় অংশই আসে ভারত থেকে। চলতি অর্থবছরে মোট আমদানির ৪৯ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত চিনিই এসেছে ভারত থেকে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি রপ্তানিকারক দেশটি তাদের রপ্তানিতে বেঁধে দিয়েছে সীমা। আর এ খবরে দেশের বাজারে পড়তে শুরু করেছে এর প্রভাব।

দেশের ভোগ্যপণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বাড়তে শুরু করেছে চিনির দাম। একদিনের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে প্রতিমণ চিনির দাম বেড়েছে ৫০-৬৫ টাকা। পাশাপাশি রমজানে চিনি আমদানি কমানোর সম্পূরক শুল্ক এখন বাড়িয়ে আগের হারে শুল্কায়ন শুরু করেছে কাস্টমস। ফলে চিনির বাজার নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।

তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ চিনি রপ্তানিকারী দেশ। এর পরের অবস্থানে ভারত। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ব্রাজিল, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও চীন থেকে চিনি আমদানি করে আসছে। তবে চলতি অর্থবছরে শুধু ব্রাজিল ও ভারত থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। তাই ভারত চিনি রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দেওয়ায় কপালে ভাঁজ পড়েছে সংশ্লিষ্টদের।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ মে পর্যন্ত বেসরকারি মিল মালিকরা ২৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫৮ টন ৪৯০ কেজি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। এরমধ্যে ব্রাজিল থেকে আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার ৩২৫ টন ৪৪০ কেজি। ভারত থেকে এসেছে অবশিষ্ট ১৩ লাখ তিন হাজার ৩৩ টন ৫০ কেজি চিনি, যা মোট আমদানির ৪৯ শতাংশের বেশি। এসব চিনির প্রায় সবই আমদানি করেছে দেশের শীর্ষ পাঁচ শিল্প প্রতিষ্ঠান।

চলতি অর্থবছরে (১ জুলাই থেকে ২৪ মে পর্যন্ত) দেশের শীর্ষ চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ ৯ লাখ এক হাজার ৪০৩ টন ৫৭০ কেজি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। এরমধ্যে ভারত থেকে প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করেছে পাঁচ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৩ টন ৫৭০ কেজি চিনি। একই সময়ে মেঘনা গ্রুপ চিনি আমদানি করেছে ৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৫ টন, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ভারত থেকে এনেছে তিন লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত চিনি।

একইভাবে এস আলম গ্রুপ চার লাখ ২৫ হাজার ৩৭ টন ২৮০ কেজি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে, যার মধ্যে ভারত থেকে এনেছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৮০০ টন। আবদুল মোনেম কোম্পানি চলতি বছরে তিন লাখ এক হাজার ১৯ টন ৪৮০ কেজি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে। এরমধ্যে এক লাখ ৩১ হাজার ১৬২ টন ৪৮০ কেজি আমদানি করেছে ভারত থেকে। দেশবন্ধু গ্রুপ এক লাখ ৯২ হাজার ৭৬ টন ১৬০ কেজি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে, যার মধ্যে ৫০ হাজার ৪০০ টন এসেছে ভারত থেকে। এছাড়া প্রাণ গ্রুপ ভারত থেকে এক হাজার সাত টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে।

মঙ্গলবার (২৪ মে) ভারতের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দেশটি চলতি মৌসুমে চিনির রপ্তানি এক কোটি টনে সীমাবদ্ধ করতে পারে। কারণ সরকারি ভর্তুকি ছাড়া ভারতীয় কারখানাগুলো চলতি ২০২১-২২ বিপণনবর্ষে এ পর্যন্ত ৮৫ লাখ টন চিনি রপ্তানির চুক্তি করে ফেলেছে। এরই মধ্যে প্রায় ৭১ লাখ টন চিনি বিদেশে পাঠিয়েছে দেশটি। ফলে নিজেদের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। যদিও কবে থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, সে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। তবে আগামী মাসের শুরু থেকেই দেশটি চিনি রপ্তানিতে লাগাম টানতে পারে বলে জানিয়েছে ভারতের ওই সরকারি সূত্র।

এদিকে, গত রমজানের আগে অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়েছিল সরকার। আগে যেখানে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক দিতে হতো, সেখানে ওই ঘোষণার পর চিনি আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। গত ১৫ মে পর্যন্ত সুবিধাটি কার্যকর ছিল। বর্তমানে আগের মতোই ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নিচ্ছে কাস্টমস।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের ১ নম্বর সেকশনের উপ-কমিশনার তারেক হাসান বুধবার বিকেলে জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপরিশোধিত চিনির ওপর চলতি অর্থবছরে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নির্ধারিত ছিল। কিন্তু গত রমজানে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশেষ এসআরও জারি করে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। গত ১৫ মে পর্যন্ত আমদানিকারকরা ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্কে চিনি খালাস নিলেও চলতি মে মাসের ১৫ তারিখের পর ওই সুবিধা আর বাড়ানো হয়নি। এখন আগের মতো ৩০ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক আদায় করা হচ্ছে।’

অন্যদিকে ভারত চিনি রপ্তানি সীমিত করার খবর প্রচারের পর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পরিশোধিত চিনির দাম বেড়েছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৪ মে) সিটি গ্রুপের প্রতিমণ চিনি বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৭৮০ টাকা। সেখানে বুধবার (২৫ মে) বিক্রি হয়েছে প্রতিমণ দুই হাজার ৮৪৫ টাকা। একইভাবে মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের চিনি বুধবার বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৮৪০ টাকায়। একদিন আগে এ চিনির দাম ছিল দুই হাজার ৭৭৫ টাকা।

তবে বুধবার খাতুনগঞ্জের বাজারে এস আলম গ্রুপের চিনি বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৭১০ টাকা মণ। এ চিনির সরবরাহ পেতে ১০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে গ্রাহকদের। তবে এস আলম গ্রুপের রেডি চিনি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৭৫০ টাকা মণে। একদিন আগেও এস আলমের রেডি চিনি ছিল দুই হাজার ৭২৫ টাকা মণ।

খাতুনগঞ্জের তেল-চিনির বড় ব্যবসায়ী আর এম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলমগীর পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজ (বুধবার) চিনির বাজার কিছুটা বেড়েছে। প্রতিমণে বেড়েছে ৫০-৬০ টাকার মতো।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমদানি করেই চিনির চাহিদা মেটায়। অপরিশোধিত চিনির বড় অংশ আমদানি করতে হয় ভারত থেকে। যদি ভারত চিনি রপ্তানি বন্ধ করে দেয় এবং বিকল্প সোর্স তৈরি করা না হয়, তাহলে বাংলাদেশে সংকট তৈরি হবে। তাছাড়া রমজানে চিনির শুল্ক কম ছিল। এখন তা বেড়ে আগের মতো হয়ে গেছে। এ কারণেও চিনির দাম বাড়তে পারে।’

বেসরকারি চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম কোম্পানির বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধান আজিজুর রহমান চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্রাজিলের পর ভারত থেকে চিনির একটি বড় অংশ আমদানি হয়। তাছাড়া যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া থেকেও অপরিশোধিত চিনি আসে। এখন ভারত চিনি রপ্তানি বন্ধ কিংবা সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিলে নিশ্চয়ই তার একটি প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে পড়বে।’

এএএইচ/এএসএ/জিকেএস