ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. বিনোদন

‘বাংলাদেশি মুসলমান’-এর ‘দম’ কেমন

অধরা মাধুরী পরমা | প্রকাশিত: ০৫:০৩ পিএম, ০৮ এপ্রিল ২০২৬

কোনো আগাম ধারণা বা প্রত্যাশা ছাড়া, ট্রেলার না দেখেই এক সন্ধ্যায় অসবর কাটাতে ঢুকে পড়লাম সিনেমা হলে। আগাম ধারণা না থাকার সুবিধা হলো, মনের একটা সাদা পাতায় পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের আঁকিবুকির স্বাধীনতা দেওয়া যায়। দিলাম।

ক্যাটাগরির ভাগাভাগিতে ‘দম’কে সারভাইভাল থ্রিলার বলে পরিচয় করানো হয়েছে। বাংলাদেশের সিনেমায় সারভাইভাল থ্রিলার ঘরানা খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু টানটান উত্তেজনা, দম আটকানো কিছু দৃশ্য আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসহ একটি উপভোগ্য সিনেমা হিসেবে এর নাম নিতে দ্বিধা নাই।

তবে সারভাইভাল থ্রিলার দেখতে যাচ্ছি, একথা মাথায় নিয়ে যেহেতু দেখা শুরু করিনি, তাই একটু আলাদা চোখে সিনেমাটা দেখলাম। কয়েকটি ভাগে অভিজ্ঞতাটা ভাগাভাগি করা যাক।

পর্দার দৃশ্য যা যা ভাবালো

প্রথমত, ধর্মীয় চরমপন্থা ও জঙ্গীবাদ নিয়ে কিছু বাংলা সিনেমা আগে দেখেছি, আর বেশি দেখেছি মার্কিনদের চোখে তালেবান। তবে বাঙালির চোখে তালেবানের উপস্থাপনা প্রথম দেখলাম।

পরিচালক রেদওয়ান রনি অবশ্য তালেবানদের মধ্যে ‘ভালো’-‘খারাপের’ একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন। পরিস্থিতির শিকার তালেবান, আদর্শগত যোদ্ধা তালেবান, প্রতিহিংসাপরায়ণ তালেবান, এমনকি তালেবান সদস্যের নিরীহ পরিবার –এমন কয়েক ধরণের তালেবানের দেখা মিলবে পর্দায়।

‘বাংলাদেশি মুসলমান’-এর ‘দম’ কেমন

দ্বিতীয়ত, সিনেমা জুড়ে আফরান নিশোর মুখে যে সংলাপ বারবার শোনা যাবে, তা হলো – ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নূর, বাংলাদেশি মুসলমান।’ আর সিনেমাজুড়ে দেখা যাবে তার অসাধারণ কিছু চারিত্রিক গুণ। সিনেমা শেষ হয়ে গেলেও মাথায় ঘুরতে থাকবে – ‘আমি শাহজাহান ইসলাম নূর, বাংলাদেশি মুসলমান।’ এই সংলাপ আর নূর চরিত্রের গুণাবলী ধীরে ধীরে আপনার মনে বাংলাদেশি মুসলমানের একটা ছবি তৈরি করতে থাকবে, যা পাকিস্তানি মুসলমান ও তালেবান মুসলমান থেকে একদম আলাদা। বাংলাদেশি মুসলমানের এই ছবি কতটা বাস্তবসম্মত, সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু পরিচালক রেদওয়ান রনির এই প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ না করে পারা গেল না।

তৃতীয়ত, আধ্যাত্মিকতা, অতিপ্রাকৃত বা কাকতালীয় ঘটনা – যে শব্দ ব্যবহার করেই লিখি না কেন, সিনেমাটিতে এমন বেশ কিছু ঘটনা দেখানো হয়েছে বেশ রুচিকর অঙ্গে। বন্দি অবস্থায় নূর ও তার স্ত্রী রানীর এক ধরনের মানসিক সংযোগকে পরিচালক পায়রার রূপকে উপস্থাপন করেছেন, যা কাকতালীয় ঘটনার সীমা অতিক্রম না করেই এক ধরনের টেলিপ্যাথিক অনুভূতি তৈরি করে। ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসকেও পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক।

বিপদের মুখে দোয়া ইউনূস নিয়ে মুসলমানের মনে যে অনুভূতি আছে, সেই অনুভূতিকে ঘিরে চমৎকার, শ্বাসরুদ্ধকর একটি সিকোয়েন্স আছে সিনেমাটিতে। এই দৃশ্যে হলের দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিলো দেখার মতো।

‘বাংলাদেশি মুসলমান’-এর ‘দম’ কেমন

চতুর্থত, অভিনয় প্রসঙ্গে বলতে গেলে আফরান নিশো ও চঞ্চল চৌধুরীর প্রশংসা দিয়ে শুরু করা উচিত। তবে প্রথমে বলতে চাই পূজা চেরীকে নিয়ে। গায়ে হলুদের দৃশ্য দিয়ে পর্দায় রানী চরিত্রের প্রবেশ। ক্যামেরার সামনে এক সুদর্শনা গ্রাম্য বউ হিসেবে পূজা চেরীর অভিনয়ে মনোযোগ কেড়েছে তার শরীরি ভাষা ও সূক্ষ্ণ ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনগুলো। সিনেমার বাঘা বাঘা সব অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে মেলালে যা মানানসই লেগেছে।

দর্শক হিসেবে চোখে লেগেছে যে বিষয়গুলো, সেগুলোও উল্লেখ করাও দরকার। এক নম্বরে ডাবিং। বেশ কিছু সিকোয়েন্সে পর্দার দৃশ্য ও ডাবিংয়ের যোগসূত্র যেন কেটে গিয়েছিলো। বিশেষ করে, প্রধান চরিত্র বাদে অন্য কোনো পার্শ্ব চরিত্র বা এক্সট্রা আর্টিস্টের সংলাপের সঙ্গে মুখভঙ্গির অমিল দেখা যায় কয়েকটি জায়গায়। তখন মনে হতে পারে, ওই চরিত্রের সংলাপের স্ক্রিপ্ট ছাড়াই বোধহয় শুটিং করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো পার্শ্ব চরিত্রের কয়েকজনার অভিনয়। তাদের পারফরমেন্সে থিয়েটার বা মঞ্চে অভিনয়ের ধাঁচটা যেন একটু বেশিই প্রকট লাগছিল। ক্যামেরার সামনে এক্সপ্রেশনের যে সূক্ষ্ণতা দরকার, তার সঙ্গে থিয়েটার ঘরানার অভিনয় যেন মিলেমিশে গিয়েছিল।

‘বাংলাদেশি মুসলমান’-এর ‘দম’ কেমন

এছাড়া কিছু ‘প্রোপাগান্ডা’র আভাস, সমাজের ক্ষমতাবান মানুষের প্রসঙ্গ গভীরে না ঢুকে এড়িয়ে যাওয়া, বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে বেশি না ভাবলে সিনেমাটি উপভোগ করতে অসুবিধা হবে না।

সিনেমাটি এখনো যারা দেখেননি, খোলা মন নিয়ে দেখার পর তারা এমন আরও অনেক কিছু দেখতে পাবেন, যা কোনো রিভিউতেই নেই। তবে শুধু সারভাইভাল থ্রিলার হিসেবে নয়, বাংলা সিনেমায় কিছু জরুরি বিষয়ে নতুন ন্যারেটিভ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে ‘দম’কে দাঁড় করানো যায়।

এএমপি/আরএমডি