কসমসের ক্যানভাসে তারুণ্যের উৎসব
তানজিদ শুভ্র
পৌষের শেষ বিকেলে ধুলোমাখা শহরের বুক চিরে একমুঠো সতেজ বাতাস যেন আচমকাই মন ভালো করে দেয়। বাতাসে দোল খাচ্ছে বাহারি রঙের অজস্র ফুল। আর সেই ফুলের সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছে একদল তরুণ-তরুণী। কেউ শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে বসে পড়ছেন ফুলের গালিচায়, কেউবা গিটারের তারে তুলছেন বসন্তের আগমনী সুর। সোশ্যাল মিডিয়া ফিড স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে সূর্যমুখী, সরিষা ফুলের পাশাপাশি কসমস নিয়েও মাতামাতি। এই শীতে তারুণ্যের নতুন পছন্দের নাম ‘কসমস’। কিন্তু কেন? কেন হঠাৎ করে বিদেশি এই বুনো ফুলটি আমাদের ইট-কাঠের নগরে এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠল?
বাংলাদেশে কসমস নতুন ফুল নয়। তবে আগের মতো শুধু বাগানে সীমাবদ্ধ নেই। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ, রাস্তার ধার, খালি জায়গা, এমনকি ছাদ বাগানেও কসমস দেখা যায়। বাণিজ্যিকভাবেও কসমস চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। শীত এলেই এই ফুল জানান দেয় নিজের উপস্থিতি। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত কসমস সবচেয়ে বেশি ফোটে। কুয়াশা ভেজা সকাল আর রোদেলা বিকেলে কসমসের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
কসমস ফুলের রং নানা ধরনের। গোলাপি, সাদা, বেগুনি, হালকা লাল। কোনোটায় আবার মাঝখানে হলুদ চাকতি। এই নরমভাবই কসমসের বড় শক্তি। বিশ্বজুড়ে প্রায় বিশটির মতো প্রজাতির কসমস দেখা যায়। সরল গড়ন, পাতলা পাপড়ি আর লম্বা নমনীয় কান্ড এই ফুলকে দিয়েছে আলাদা একটি পরিচয়।
কসমস আসলে সৌন্দর্যের সহজ পাঠ। গ্রিক ভাষায় ‘কসমস’ শব্দের অর্থ ঐকতান বা সুশৃঙ্খল মহাবিশ্ব। এই ফুলের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম কসমস বাইপিনাটাস। কসমসের আদি নিবাস মেক্সিকো। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছে জাপান, কোরিয়া, চীনসহ নানা দেশে। জাপানে কসমস উৎসব হয়। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কসমসের চাষ, দর্শনার্থীদের ভিড়, ছবি আর হাঁটার পথ। সেই সংস্কৃতির কিছুটা ছোঁয়া যেন এখন দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশেও।
বাংলাদেশের তরুণদের কাছে কসমস এখন বেশ জনপ্রিয়। এই মৌসুমে প্রায় সব ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আঙিনায় চোখে পড়ে রং বেরঙের কসমসের স্নিগ্ধতা মাখা রূপ। কসমসে গোলাপ বা রজনীগন্ধার মতো ভারী আভিজাত্য নেই। আছে বুনো, হালকা, সহজ সৌন্দর্য। কখনও মনে হয়, কাগজের মতো পাতলা। কখনও মনে হয়, স্বচ্ছ কাঁচ। কসমস বাগানে দাঁড়ালে মনে হয়, যেন কোনো শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। শহুরে জীবনে আমরা প্রতিদিন কংক্রিট, ধোঁয়া আর শব্দের ভেতর আটকে থাকি। সেই ক্লান্তির মধ্যে হঠাৎ এই রঙের বিস্ফোরণ এক ধরনের মানসিক স্বস্তি দেয়।
ঢাকার অদূরে মেঘনা নদীর তীরবর্তী নরসিংদী জেলার নাগরিয়াকান্দির এক বিশাল বাগানে ফুলের টানে ছুটে গিয়েছিলেন তরুণ কর্মজীবী লাইজু আক্তার। বাগানে ঘুরে বেড়ানোর সময় নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা শহরে থাকি, তারা সচরাচর খোলা মাঠে, নদীর ধারে কিংবা ক্ষেতের আইলে যাওয়ার সুযোগ পাই না। ফলে প্রকৃতির প্রকৃত সৌন্দর্য আমাদের আড়ালেই থেকে যায়। নিজেদের সূর্যমুখী, সরিষা এবং কসমস ফুলের সঙ্গে ফ্রেমে বন্দি করার জন্য হলেও যে মানুষ প্রকৃতির কাছে ছুটে যাচ্ছে, বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগছে।’
কসমস দেখতে যেমন সহজ সরল গঠন, চাষ করাও তেমনি সহজ। অল্প যত্নে, কম খরচে কসমস ফুটে ওঠে। বীজ ছিটিয়ে দিলেই হয়। বেশি সার লাগে না। খুব নিয়মিত পানি না দিলেও চলে। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে কসমস ভালোভাবে মানিয়ে নেয়। পূর্ণ সূর্যালোকে কিংবা অল্প ছায়াযুক্ত স্থানেও কসমস বেড়ে উঠে। স্কুলের বাগান, বাড়ির ছাদ, অফিস আঙিনা-সব জায়গায় কসমস মানানসই। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই বর্ণিল সাজে সাজিয়ে তুলতে পারে কসমস।
কসমস শুধু পুষ্পপ্রেমীদের টানে না, এই ফুল মৌমাছি ও প্রজাপতিকেও কাছে টানে। যেখানে শহরে প্রাকৃতিক পরাগায়নকারী দ্রুত কমছে, সেখানে কসমস নীরব কর্মী। পরিবেশের দিক থেকেও এভাবেই কসমস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কসমসের পাপড়িতে প্রজাপতি বসার দৃশ্য আলাদা এক সৌন্দর্য তৈরি করে। রঙিন ডানার নড়াচড়া ফুলের স্থিরতায় প্রাণ আনে। অনেকেই এই মুহূর্তের জন্য ক্যামেরা হাতে নিঃশব্দে অপেক্ষা করেন।
নাগরিক ব্যস্ততায় সৌন্দর্যের খোঁজে আমরা কত আয়োজন খুঁজি। অথচ কসমস তার সারল্যেই ছড়িয়ে দেয় রং আর স্নিগ্ধতা। ক্লান্তিময় বিষণ্ণ বিকেলে বাহারি রঙের ফুলের দিকে তাকাতেই অজান্তে ঠোঁটের কোণে জমা হতে পারে মৃদু হাসি।
আরও পড়ুন
দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়বো স্বদেশ
এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর
কেএসকে