শীতে পথশিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়
নাজিয়াত আক্তার
শীতের আগমন মানেই প্রকৃতি তার রূপ বদলে নেয়। কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস, জমাট শীতলতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকতার পরিবর্তন ঘটায়। শীত অনেকের কাছে আনন্দের ঋতু হলেও সমাজের এক বিশাল অংশ পথশিশুদের জন্য তা দুঃসহ বাস্তবতার প্রতীক।
শীতের রাতে যখন আমরা উষ্ণ বাড়িতে কম্বল মুড়িয়ে আরাম করি, তখন কোনো ফুটপাতের কোণে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কিংবা মার্কেটের বারান্দায় কাঁপতে থাকা শিশুদের দেখা যায়। তাদের নেই গরম কাপড়, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই খাবারের নিশ্চয়তা। আর তাই শীতে পথশিশুদের যথার্থ সহায়তা করা শুধু দান বা উপকার নয় এটি সমাজে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পথশিশুরা সমাজের অন্যতম অবহেলিত শ্রেণি। জন্ম বা পরিস্থিতির কারণে তারা বেড়ে ওঠে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। অনেকেই পিতামাতাহীন, কেউবা দারিদ্র্যের কারণে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। শীতের মতো কঠিন সময়ে তাদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। শীতবস্ত্র না থাকায় অনেক শিশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে অনেক সময় মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
তাদের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই অবস্থায় আমাদের দায়িত্ব মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। মাঝে মাঝে আমরা দেখি যে তাদের এই করুণ দশায় সরকারের কোনো কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নেই । তবে যদি রাষ্ট্রকর্তৃক জোরালো ভূমিকা পালন করে তবে এইসব শিশুদের জীবন ও সুন্দর হয়ে উঠবে। পথশিশুদের সহায়তা করা মানে শুধু দুঃস্থকে কিছু দান করা নয়, বরং তাদের প্রতি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করা।
শীতবস্ত্র বিতরণ করা খুব প্রয়োজনীয়। অনেকের ঘরে অতিরিক্ত পুরোনো কাপড় পড়ে থাকে, যা আমাদের কাছে হয়তো অপ্রয়োজনীয়; কিন্তু কোনো পথশিশুর জন্য তা হতে পারে জীবন বাঁচানোর উপায়। নতুন বা পুরোনো কম্বল, সোয়েটার, জ্যাকেট, স্কার্ফ, মোজা, জুতো ইত্যাদি সংগ্রহ করে সংগঠিতভাবে তাদের মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, যুবসমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক মাধ্যমের উদ্যোগে এটি সহজেই করা সম্ভব।
শুধু কাপড় দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না শীতকালে খাবারও তাদের প্রয়োজন। ঠান্ডায় ক্যালোরি ক্ষয় বেশি হওয়ায় তারা পুষ্টিকর খাবার না পেলে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। গরম খিচুড়ি, রুটি-সবজি, স্যুপ, দুধ, বিস্কুট ইত্যাদি সামান্য হলেও তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। বিভিন্ন স্থান যেমন রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ব্রিজের নিচে বা বাজার এলাকায় গিয়ে খাবার সরবরাহ করা যেতে পারে। চাইলে সপ্তাহে একদিন নিয়মিত খাদ্য পরিবেশনের ব্যবস্থা করা যায়, যা মানবতার চর্চাকে স্থায়ী রূপ দেবে।
পথশিশুদের শীতকালীন চিকিৎসা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, চর্মরোগে ভোগে। ক্ষুদ্র মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন, প্রাথমিক ওষুধ বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবান দেওয়া তাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।স্থানীয় ডাক্তাররা স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণ করলে এ প্রচেষ্টা আরও সফল হবে।
তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে যেখানে তারা রাতে থাকতে পারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়ের অব্যবহৃত কক্ষ, কমিউনিটি সেন্টার বা সংগঠনের নিজস্ব জায়গা ব্যবহার করা যায়। উষ্ণ ঘুমের পরিবেশ পেলে শিশুরা নিরাপত্তাবোধ পায় এবং রোগের ঝুঁকি কমে।
এছাড়া পথশিশুদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করা না হলে সহায়তা শুধুই মৌসুমি হয়ে থাকবে। তাই শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। অনেক শিশুরই পড়াশোনার প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকে; সুযোগের অভাবেই তারা অন্ধকারে ডুবে থাকে। তাদের জন্য খোলা আকাশের নিচে ছোট লাইব্রেরি/পাঠশালা, প্রাথমিক শিক্ষা ক্লাস, পেশাগত প্রশিক্ষণ-এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের পথ পরিবর্তনের আলো এনে দিতে পারে। একটি কম্বল আজ তাকে শীত থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু শিক্ষা তার সারাজীবনের হাতিয়ার।
শীতে পথশিশুদের যথার্থ সহায়তার প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত থাকে মানবিকতা ও সহমর্মিতায়। আমরা যদি প্রত্যেকে সামান্য করে সহায়তা করি, তবে সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিএসআর কার্যক্রমে এই শিশুদের জন্য প্রকল্প নিতে পারে। মসজিদ-মন্দির-গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও শীতবস্ত্র বিতরণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারে। মিডিয়া সমাজকে সচেতন করতে পারে, মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি-গোষ্ঠী ও সমাজ মিলেই গড়ে তুলতে পারে এক মানবিক সমাজ।
মানবতা মানে শুধু বড় কাজ নয় ছোট কাজও বড় হৃদয়ের প্রমাণ। কেউ গরম কাপড় দিয়ে সাহায্য করতে পারে, কেউ খাবার রান্না করে দিতে পারে, কেউ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে, আবার কেউ সময় দিয়ে শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারে। সাহায্য হোক প্রতিদানের আশায় নয়, বরং নিঃস্বার্থ মানবতাবোধে।
শীতে পথশিশুদের সহায়তা শুধু সামাজিক কর্তব্য পূরণ নয় এটি আমাদের মানসিক পরিশুদ্ধতা, নৈতিক দায়িত্ব ও মানবতার পরিচয় বহন করে। আমাদের একটুখানি উদ্যোগ একটি শিশুর মুখে হাসি এনে দিতে পারে, একটি জীবন বাঁচাতে পারে। আমরা যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়াই, তবে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা শুধু সম্ভবই নয়, তা হবে আমাদের মানবতার সর্বোচ্চ সাফল্য। শীতের এই সময়ে আসুন পথশিশুদের পাশে দাঁড়াই, মানবতার আলোকশিখা জ্বালিয়ে দিই একটি উষ্ণতা ছড়িয়ে দিই অন্যের জীবনে, নিজের মনেও।
আরও পড়ুন
দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়বো স্বদেশ
আলো-ছায়ার লুকোচুরি, কুয়াশায় মোড়া ঢাকার সকাল
লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিচার, কলাম এন্ড কনটেন্ট রাইটার্স
কেএসকে