ইরানের শেষ রানির মুকুট রাজকীয় ঐতিহ্যের এক নিদর্শন
ইরান তার শিল্পকর্মের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। পাহাড়, মরুভূমি, রঙিন মসজিদ এবং প্রাচীন সভ্যতার চিহ্নের সমাহারে গঠিত এক অপরূপ ভূস্বর্গ এখানে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য একসঙ্গে গাঁথা, আর সময়ের ছোঁয়া মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে একটি অনন্য সংস্কৃতি।
ইরানের অর্থনীতির ভিত্তি শুধুমাত্র তেল বা গ্যাস নয়; দেশটির জাতীয় রত্নভাণ্ডারও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও মূল্যবান রত্নসম্ভার হিসেবে পরিচিত এই ‘ক্রাউন জুয়েলস’ বা রাজরত্নসম্ভার কেবল ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নয়, বরং দেশের অর্থনীতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ভরসাও বটে। পারস্য সাম্রাজ্যের যুগ থেকে কাজার ও পাহলভি রাজবংশ পর্যন্ত এই রত্নগুলো ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ইরানের শেষ সম্রাজ্ঞী ফারাহ পাহলভি, যিনি ফারাহ দিবা নামেও পরিচিত, ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করেন। তিনি ছিলেন ইতিহাসের প্রথম মুসলিম নারী, যিনি রাজকীয় মুকুট পরেন।

ফারাহ পাহলভির এই মুকুট কেবল একটি গহনার বস্তু নয়, বরং ইরানের রাজকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব নিদর্শন। ১৯৬৭ সালে সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি তার অভিষেক অনুষ্ঠানে রানি ফারাহকে গোলেস্তান প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকভাবে মুকুট পরান।
রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানে রানি এলিজাবেথও মুগ্ধ হন ফারাহ পাহলভির পরিধান করা মুকুট দেখে। মুকুটের নকশা, রত্নের সংমিশ্রণ এবং খোদাই করা ডিজাইন ঐতিহ্যবাহী পাহলভি মুকুটকে আরও আকর্ষণীয় করেছে এবং ইরানের অতীতকে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করেছে।

মুকুট যেভাবে তৈরি হয়েছিল
ফারাহ পাহলভির মুকুট তৈরি করা হয় ১৯৬৬ সালে এবং এটি পুরোপুরি ইরানের জাতীয় কোষাগারের রত্ন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। আইনত এই মূল্যবান রত্ন দেশ থেকে বের হতে পারত না। এ কারণে, শাহ মুকুট তৈরি করার দায়িত্ব দেন বিখ্যাত ফরাসি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলসকে।
ফরাসি ডিজাইনার পিয়েরে আর্পেলস ছয় মাসে তেহরানে ২৪ বার ভ্রমণ করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টের ভেতরে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে প্রতিটি মূল্যবান পাথর হাতে বেছে মুকুট তৈরি করেন।
মুকুটে রয়েছে ১,৪৬৯টি হীরা, ৩৬টি পান্না, ৩৬টি রুবি ও স্পিনেল, ১০৫টি মুক্তা এবং একটি কেন্দ্রীয় পান্না, যার ওজন প্রায় ৯২ থেকে ১৫০ ক্যারেট। মুকুটটি সবুজ মখমল দিয়ে আবৃত এবং এর মোট ওজন প্রায় দুই কিলোগ্রাম।
মুকুটের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক জোড়া পান্নার কানের দুল এবং একটি নেকলেস, যা খোদাই করা ষড়ভুজাকার পান্না, নাশপাতি আকৃতির মুক্তা এবং ১১টি হলুদ হীরায় দিয়ে। নকশা অনুযায়ী বড় রত্নটি মাথার মাঝখানে থাকে, আর ছোটগুলো পিছনে, যা ইরানের রাজকীয় ঐতিহ্য এবং ফরাসি জুয়েলারির সুন্দর সংমিশ্রণ ফুটিয়ে তোলে।

মুকুটের সঙ্গে গহনার সৌন্দর্য ও নকশা
ফারাহ পাহলভির মুকুটের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক জোড়া পান্নার কানের দুল এবং একটি নেকলেস। নেকলেসে খোদাই করা ষড়ভুজাকার পান্না, নাশপাতি আকৃতির মুক্তা এবং ১১টি হলুদ হীরা ব্যবহার করা হয়েছে।
মুকুটের নকশা অনুযায়ী সবচেয়ে বড় রত্নটি পরিধানকারীর মাথার মাঝখানে অবস্থান করে, আর ছোটগুলো পিছনের দিকে থাকে। এই নকশা ইরানের রাজকীয় ঐতিহ্য এবং ফরাসি জুয়েলারির সুন্দর সংমিশ্রণ ফুটিয়ে তোলে।মুকুট এবং এর আনুষঙ্গিক গহনা ফারাহ পাহলভির রাজকীয় সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
রাজ্যাভিষেকের জন্য ভ্যান ক্লিফ এবং আর্পেলস শাহের কন্যা ও বোনদের জন্য আরও কিছু মূল্যবান গয়না, প্যারুসও তৈরি করেছিলেন, যা পুরো অনুষ্ঠানকে আরও আকর্ষণীয় ও অভিজাত করেছে।

রাজ্যাভিষেকের আরেকটি চমক ছিল
রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানে ফারাহ পাহলভি চড়েছিলেন জোসেফ ক্লাইম্যান নামের একজন ভিয়েনা কোচ প্রস্তুতকারকের তৈরি গাড়িতে, যার মূল্য ছিল ৭৮,০০০ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৯ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকার বেশি। তার পোশাকও ছিল রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক।
ফারাহ ফরাসি ডিজাইনের পোশাক বেছে নিয়েছিলেন, এবং ছয়জন সম্মানিত দাসী তার পোশাকের ট্রেন বহন করছিলেন, যা তাকে আরও প্রভাবশালী এবং রাজকীয় দেখাচ্ছিল।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ফারাহ পাহলভির মুকুট প্রথমবার জনসাধারণের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল, যা ইরানের রাজকীয় ঐতিহ্য এবং গহনার শীর্ষ শিল্পকর্মের এক অসাধারণ প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ফারাহ পাহলভির মুকুট, যা শাহবানু ক্রাউন নামে পরিচিত, বর্তমানে তেহরানের রয়্যাল জুয়েলস মিউজিয়ামের ট্রেজার চেম্বারে সংরক্ষিত। এই মূল্যবান মুকুটকে ২৪ ঘন্টা সশস্ত্র প্রহরীদের নজরদারিতে রাখা হয়।
বিরল রাজকীয় নিদর্শনগুলোর মধ্যে এটি একটি, এবং এর ইতিহাস ও সৌন্দর্য আজও রহস্যময় কাহিনী হিসেবে মানুষকে মুগ্ধ করে।
সূত্র: টাইমস নাউ, এনডিটিভি
আরও পড়ুন:
বেনারস থেকে বেনারসি, বিয়েতে কেন এই শাড়ি জনপ্রিয়
বিয়ের এক মাস আগে থেকেই কনেকে কাঁদতে হয় যেখানে
এসএকেওয়াই/